Saturday, April 24, 2010
রাজাকার হলেও যুদ্ধাপরাধী ছিলেন না
১৯৭২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কোনো সরকারের আমলে কখনোই বাংলাদেশী নাগরিকদের যুদ্ধাপরাধী বলে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা কেউ করেনি। কেউ ভাবেওনি। এই পুরো সময়টা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর লোকদেরই যুদ্ধাপরাধী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মধ্য দিয়ে চিহ্নিত ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমা করে দেন শেখ মুজিবুর রহমান। এ ইস্যুটিও সেখানেই সমাপ্ত হয়। জেনারেল মইন ভারত সফরে গিয়ে সেখান থেকে এ কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজের ছবক নিয়ে এসে বাংলাদেশীদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধী খোঁজার অপতৎপরতায় লিপ্ত হন। তারও সুস্পষ্ট লক্ষ্য, স্বাধীনতা যুদ্ধের ৪০ বছর পর এসে জাতিকে বিভক্ত করে বিদেশী হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র প্রশস্ত করে তোলা।
লক্ষ করলে দেখা যাবে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে অসাংবিধানিক স্বৈচারার মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকারের আমলে হঠাৎ করেই যারা সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন, সরকার বদল হলেও এখনো তারাই চিল্লাপাল্লা করে যাচ্ছেন। ‘গণতান্ত্রিক’ সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেও তাদের অ্যাজেন্ডায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ তারা যাদের হাতের ক্রীড়নক ছিলেন, এখনো তাদের হাতের পুতুল হয়ে জাতি বিভাজনের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। এখন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, জেনারেল মইন সরকারকে যারা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় এনেছিলেন, তারা এখনো বাংলাদেশে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণকারী এবং তাদের ইশারায়ই সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মীমাংসিত বিষয়টি যখন আবার স্বাধীনতার ৩৮ বছর পর সামনে নিয়ে আসা হলো, তখনই আমরা সতর্ক করেছিলাম, স্বাধীনতার এত দিন পর বাংলাদেশের মধ্যে যুদ্ধাপরাধী খোঁজা এক বিপজ্জনক পদক্ষেপ হবে। আর ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলতে যাদের চিহ্নিত করা হতে শুরু করল তাদের মধ্যে রাজাকারদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হলো। এমনকি রাজাকার না হলেও জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেই তাদের যুদ্ধাপরাধী বলা শুরু হয়ে গেল। শেষে তা নগ্নভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ব্যবহার হতে শুরু করল। পরিস্খিতি এমন দাঁড়িয়েছে, আওয়ামী লীগের সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বলে বসেছেন, যুদ্ধাপরাধের দায়ে বেগম খালেদা জিয়ারও বিচার করা হবে। সাজেদা চৌধুরীর মতে, ‘মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানের এক জেনারেলের সাথে বেগম খালেদা জিয়া সেনাক্যাম্পে থেকে মুক্তিযোদ্ধা হত্যার পরিকল্পনায় ছিলেন। সেই অপরাধে তার বিচার হবে। রাজাকারের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে রুখতে হবে।’
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা উভয়েই অন্তরীণ ছিলেন। পারিবারিক কারণে শেখ হাসিনার যেটুকু রাজনীতি-সংশ্লিষ্টতা তখন ছিল, বেগম খালেদা জিয়ার তা-ও ছিল না। তাই সাজেদা চৌধুরীর কথার জবাবে কেউ শেখ হাসিনা সম্পর্কে হুবহু একই কথা বললে কি তাকে দোষারোপ করা যাবে? এসব বক্তব্য কটু কথা আহ্বান করার শামিল।
রাজাকারদের ঢালাওভাবে যুদ্ধাপরাধী বলার বিপদ সম্পর্কে আমরা সরকারকে আগেও সতর্ক করেছিলাম। তাতে আওয়ামী লীগের ভেতরেও হাজার হাজার যুদ্ধাপরাধী পাওয়া যাবে বলে আশঙ্কা করেছিলাম। এই জজবা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও এখন ধারণা করছে, রাজাকার মানেই যুদ্ধাপরাধী। আর তাই ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার বেয়াই শ্রম ও কর্মসংস্খান মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের বাবা যে বড় রাজাকার ছিলেন সে কথা উল্লেখ করেছে। গত ২২ এপ্রিল আওয়ামী লীগ নেতাদের মুখে এ কথা শুনে ক্ষেপে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের বলেন, দেশে রাজাকার বলে কোনো শব্দ নেই। দেশে কোনো রাজাকার নেই। তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের দাদাশ্বশুর ফরিদপুর সদর উপজেলার কৈজুরী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম খন্দকার নুরুল হোসেন নুরু মিয়া ফরিদপুরে রাজাকারদের তালিকায় ১৪ নম্বর রাজাকার হলেও তিনি যুদ্ধাপরাধী ছিলেন না। একই সাথে তিনি আওয়ামী লীগের ফরিদপুরের নেতাদের কাছে প্রশ্ন করেন, তার ভাই শেখ সেলিম ফরিদপুরের রাজাকার, মুসা বিন শামসিরের ওরফে সূইলা মূসার মেয়ের সাথে ছেলে বিয়ে দিয়ে আত্মীয়তা করেছেন, এটা তারা কখনো বলেন না। অথচ শেখ হাসিনার মেয়ের দাদাশ্বশুর নুরু মিয়ার নামে সবাই অভিযোগ করেন, তিনি রাজাকার ছিলেন। শেখ হাসিনা গর্বের সাথে আওয়ামী লীগ নেতাদের জানিয়ে দেন নুরু মিয়া পিস কমিটির সদস্য থাকলেও যুদ্ধের সময় তিনি কোনো অপরাধমূলক কাজকর্ম করেননি।
প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। অর্থাৎ এমনকি রাজাকার বা পিস কমিটির সদস্য হলেও তিনি যুদ্ধাপরাধী হতে পারেন না। এ কথা আমরা আওয়ামী লীগের মতলববাজ নেতা ও তাদের পোঁধরা বিদেশী স্বার্থের তল্পিবাহক তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার, আলবদর, আলশামস প্রভৃতি বাহিনী যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সে সহযোগিতা যুদ্ধাপরাধী পর্যায়ে কখনো পৌঁছেছিল কি না, সেটা সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয়। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি খুন, ধর্ষণ অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের মতো কোনো অপরাধের সাথে জড়িত থাকলেই কেবল তাকে যুদ্ধাপরাধী বলে চিহ্নিত করা যাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যে একই কথা প্রতিফলিত হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান দালাল আইন প্রণয়ন করেছিলেন ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি। এ আইনের অধীনে তখন প্রায় ১ লাখ লোককে গ্রেফতার করা হয়েছিল। অভিযোগ আনা হয় এদের মধ্যে ৩৭ হাজার ৪১১ জনের বিরুদ্ধে। এ অভিযুক্তদের মধ্যে ৩৪ হাজার ৬২৩ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে কোনো মামলাই দায়ের করা সম্ভব হয়নি। মাত্র ২ হাজার ৮৪৮ জনকে বিচারে সোপর্দ করা হয়। বিচারে ৭৫২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। অবশিষ্ট ২ হাজার ৯৬ জন বেকসুর খালাস পায়। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে দালাল হিসেবে মাত্র ৭৫২ জন অপরাধী ছিল। কিন্তু তাদের কেউই মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধের মতো কোনো কাজ করেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর শেখ মুজিবুর রহমান যখন দালাল আইনে সাজাপ্রাপ্তদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন, তখন সাজাপ্রাপ্ত সবাই কারাগার থেকে মুক্তি পায়। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলেও হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের এ চারটি অপরাধকে সাধারণ ক্ষমতার বাইরে রাখা হয়। অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধমূলক যেকোনো অপরাধের জন্য সে সময় মামলা দায়েরের সুযোগ ছিল না। কিন্তু সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা-পরবর্তী শেখ মুজিবুর রহমানের দেড় বছর এবং পরবর্তী আরো সাড়ে চার মাসে দলাল আইনের অধীনে সারা দেশে কোথাও আর একটি মামলাও দায়ের করা হয়নি। ফলে আইনটি এমনিতেই অচল হয়ে পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে দালাল আইন রুদ্ধ করা হয়।
সে সময় এসব অপরাধের ক্ষতগুলো তরতাজা ছিল। স্মৃতিও ছিল অম্লান। তারপর ৩৯ বছর পেরিয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশের ভেতরে হারিকেন দিয়ে যুদ্ধাপরাধী খোঁজা হচ্ছে। পৃথিবীর যুদ্ধাপরাধী শনাক্তকরণ ও বিচারের কোনো প্রক্রিয়াতেই কখনো কোনো বেসামরিক ব্যক্তির নাম আসেনি। এমনকি যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পাঁচ কোটি মানুষের প্রাণ গিয়েছিল, লাখ লাখ কোটি টাকার সম্পদের বিনাশ ঘটেছিল, সে বিশ্বযুদ্ধেও যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বেসামরিক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়নি। যাদের চিহ্নিত ও বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল, তারা সবাই ছিল সামরিক ব্যক্তি। তাদের অভিযোগ উথাপন, সাক্ষীসাবুদ, জেরা সবকিছুই করা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ১৯৪৫ সালে। সে সময় যারা আত্মগোপন করেছিলেন, পরবর্তীকালে তাদের পাওয়া গেলে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছিল। নতুন করে কাউকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস চালানো হয়নি। সম্ভবত সেটাই হচ্ছে ন্যায্যতা।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সবাই চাইছে। কিন্তু বাংলাদেশে চিহ্নিত ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী, যাদের সবাই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য, বিচার করার জন্য তাদের কোথায় পাওয়া যাবে? আর মতলবিভাবে যে জামায়াত নেতাদের নাম যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তালিকায় প্রকাশ করা হচ্ছে তাদের কেউই ১৯৭২-৭৩ সালে যুদ্ধাপরাধী বলে চিহ্নিত হননি কিংবা দালাল আইনে গ্রেফতার বা সাজার মুখোমুখি হননি। এমনকি সে সময় কারো বয়স ছিল মাত্র ৪ থেকে ১০ বছর। ফলে যুদ্ধাপরাধ করার মতো বয়সও তাদের ছিল না। আমাদের উদ্বেগ এখানেই। এসব পদক্ষেপ থেকে প্রতীয়মান হয়, সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্যই বিষয়টি নিয়ে মাঠে নেমেছে। জামায়াতের রাজনীতি মোকাবেলা করতে হলে রাজনীতি দিয়েই করতে হবে; কূটকৌশল দিয়ে নয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারাবাহিকতা বহাল রাখতে সব মত-পথের রাজনীতি করার অধিকার উন্মুক্ত রাখতে হবে। অন্যথায় সে টানে রশি ছিঁড়ে যাবে।
Sunday, April 18, 2010
দিল্লী চুক্তির পোস্টমর্টেম : যুদ্ধাপরাধ বিচারের কোন নৈতিক ও আইনগত ভিত্তি নেই
দুই
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩ জারী হয় ২০ জুলাই ১৯৭৩ সালে। এখন আর এটি বিশদভাবে বুঝিয়ে বলার কোন প্রয়োজন পড়ে না যে, বাংলাদেশে এই আইনটি করা হয়েছিলো পাকিস্তানী সৈন্যদের মধ্যে যারা যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলো তাদের বিচার করার জন্য। এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমান একবার নয়, দু'বার নয়, অসংখ্যবার ওয়াদা করেছিলেন।
শেখ মুজিবুর রহমান এবং তৎকালীন পরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ অসংখ্য বার ঘোষণা করেছেন যে, বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধের বিচার হবেই। ১৯৭২ সালের জুন মাসে বিষয়টির একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়া শেখ মুজিব এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠানের প্রস্তাব করেন। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামাদ আজাদ তাৎক্ষণিকভাবে সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেন। যখন চারিদিকে গুঞ্জন ছড়িয়ে যায় যে, বাংলাদেশের মতামতের তোয়াক্কা না করেই ভারত ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দীকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠাবার উদ্যোগ নিচ্ছে তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব দৃঢ়তার সাথে বলেন যে, ভারত একাজ করতেই পারে না। কারণ পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমান্ডের কাছে। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, স্বাধীনতার পর পরই বাংলাদেশের নতুন সরকার সমস্ত যুদ্ধবন্দীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চেয়েছিলো। পরে তারা যখন বুঝতে পারে যে, বাস্তবে এই কাজটি করা সম্ভব নয়, তখন তারা বিচার করার জন্য যুদ্ধাপরাধীর সংখ্যা নির্ধারণ করে ১৫০০। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৩ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সমগ্র সময় ছিলো বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রচারণার সময়। প্রতিটি নির্বাচনী প্রচারণায় এবং সভা-সমিতিতে শেখ মুজিব থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতা বলেন যে, বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধের বিচার হবেই (ERA OF SHEIKH MUJIBUR RAHMAN t পৃষ্ঠা ১৯৭)।
যখন দেখা যায় ১৫০০ সংখ্যাটি অনেক বড় হয়ে গেছে তখন এই সংখ্যা আরো কমিয়ে ১৯৫ এ নির্ধারণ করা হয় এবং এই ১৯৫ জনের নাম-ধামও নথিভুক্ত করা হয়। অথচ এত কিছুর পরও যুদ্ধাপরাধে ঐ ১৯৫ জন পাকিস্তানী সৈন্যের বিচার করা সম্ভব হয়নি। কেন করা সম্ভব হয়নি? সে ব্যাপারে আমরা কিছু বলবো না। ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল ভারত-বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি যৌথ ইশতেহার স্বাক্ষরিত হয়। ঐ ইশতেহারের ১৩, ১৪ ও ১৫ অনুচ্ছেদসমূহ সম্মানিত পাঠক ভাই-বোনদের জ্ঞাতার্থে হুবহু উদ্ধৃত করা হলোঃ
তিন
13. The question of 195 Pakistani prisoners of war was discussed by the three Ministers in the context of the earnest desire of the Governments for reconciliation, peace and friendship in the sub-continent. The Foreign Minister of Bangladesh stated that the excesses and manifold crimes committed by those prisoners of war constituted, according to the relevant provisions of the UN General Assembly resolutions and international law, war crimes, crimes against humanity and genocide, and that there was universal consensus that persons charged with such crimes as 195 Pakistani prisons of war should be held to account and subjected to the due process of law. The Minister of State for Defense and Foreign Affairs of the Government of Pakistan said that his Government condemned and deeply regretted any crimes that may have been committed.
14. In this connection, the three Ministers noted that the matter should be viewed in the context of the determination of the three countries to continue resolutely to work for reconciliation. The Ministers further noted that following recognition, the Prime Minister of Pakistan had declared that he would visit Bangladesh in response to the invitation of the Prime Minister of Bangladesh and appealed to the people of Bangladesh to forgive and forget the mistakes of the past in order to promote reconciliation. Similarly, the Prime Minister of Bangladesh had declared with regard to the atrocities and destruction committed in Bangladesh in 1971, that he wanted the people to forget the past and to make a fresh start, stating that the people of Bangladesh knew how to forgive.
15. In the light of the foregoing and, in particular, having regard to the appeal of the Prime Minister of Pakistan to the people of Bangladesh to forgive and forget the mistakes of the past, the Foreign Minister of Bangladesh stated that the Government of Bangladesh had decided not to proceed with the trials as an act of clemency. It was agreed that the 195 prisoners of war might be repatriated to Pakistan along with the other prisoners of war now in the process of repatriation under the Delhi Agreement.
(উদ্ধৃতিটি বড় বলে এর বাংলা অনুবাদ সংক্ষিপ্ত আকারে নিম্নে প্রদত্ত হলো।)
১৩. এই উপমহাদেশে শান্তি এবং মৈত্রীর তাগিদে ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দির বিষয় আলোচিত হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে, ওরা যেসব অপরাধ করেছে, সেগুলো যুদ্ধাপরাধ, মানবতা বিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার আওতায় পড়ে। তাদেরকে আইনের আওতায় আনা উচিত। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে, যদি কোন অপরাধ সংঘঠিত হয়ে থাকে তাহলে তার জন্য পাকিস্তান গভীর পরিতাপ প্রকাশ করছে।
১৪. তিন দেশের মন্ত্রীরা বলেন যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে যাবেন এবং সমঝোতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে অতীতের ভুল-ভ্রান্তিগুলো ভুলে যাওয়া ও ক্ষমা করার জন্য তিনি বাংলাদেশের জনগণের কাছে আবেদন জানাবেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যে অত্যাচার এবং ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, সেই দুঃখময় অতীত ভুলে যাওয়ার জন্য তিনি বাংলার জনগণের কাছে অনুরোধ করবেন। তিনি বলেন যে, বাংলাদেশের জনগণ জানে কিভাবে ক্ষমা করতে হয়।
১৫. এই পটভূমিতে, বিশেষ করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক অতীতের ভুল-ভ্রান্তি ভুলে যাওয়া এবং ক্ষমা করার জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জনগণের কাছে যে আবেদন করেছেন সেই পটভূমিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করেন, বাংলাদেশ সরকার অনুকম্পার নিদর্শন হিসেবে এই বিচার না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই ব্যাপারে সকলেই সম্মত হন যে, অন্যান্য যুদ্ধবন্দিসহ এই ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দিকে দিল্লী চুক্তির আওতায় পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হবে।...
চার
এটি গেল প্রস্তাবিত বিচারের পররাষ্ট্রীয় দিক। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন রচনা করেছে সেটি এই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের জন্য করা হয়েছিলো। এই ইশতেহারের পর ঐ আইনের কোন প্রাসঙ্গিকতা থাকে কি না, সেটি আইনজ্ঞরা বিবেচনা করে দেখবেন। অনুরূপভাবে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে, দালাল আইনে প্রায় ১ লক্ষ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে সরকার মাত্র ৭৫৮ জনকে শাস্তি দিতে সক্ষম হয়। অবশিষ্ট হাজার হাজার ব্যক্তিকে সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে ছেড়ে দিতে হয়। এই পটভূমিতেই শেখ মুজিব সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। বলা হয় যে, ১১ হাজার ব্যক্তিকে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য আলাদা করে রাখা হয়েছিল। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পরেও শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় ছিলেন। এই দুই বছরে মাওলানা নিজামীসহ আজকের জামায়াতের কোন শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে কোন মামলাই তারা দাঁড় করাতে পারেননি। এসব কারণে ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিনে দালাল আইন বাতিল হয় এবং ঐ ১১ হাজার ব্যক্তিও মুক্তি পায়। ৩৮ বছর আগে যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বা মানবতা বিরোধী অপরাধের কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি, সেখানে ৩৮ বছর পর সেই প্রমাণ কোত্থেকে আবিষ্কৃত হবে?
নৈতিকতা ও আইন দাবি করে যে, ৩৮ বছর পরে উপরে উল্লেখিত কারণে ১৯৫ জন ছাড়া অন্যদের বিচার যুক্তির ধোপে টিকে না। তারপরও শেখ হাসিনা যদি ব্রুট মেজোরিটির জোরে বিচার করেন এবং উপযুক্ত প্রমাণ পত্র ছাড়া শাস্তি প্রদান করেন তাহলে বলতে হবে, বাংলাদেশ ‘মগের মুল্লুকে' পরিণত হয়েছে। এখানে ‘জোর যার মুল্লুক তার নীতি'ই সবকিছুর উপর প্রাধান্য পাচ্ছে।
'৭৩ সালের যুদ্ধাপরাধ আইন শুধুমাত্র পাক-যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্যই প্রণীত
পর্যবেক্ষকমহলের মতে ১৯৭৩ সালে প্রণীত পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আইনের এ অপব্যবহার এবং এ আইনের অধীনে বাংলাদেশের অসামরিক লোকদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধী তৈরি জন্য তদন্ত কমিটি গঠন এবং মামলা পরিচালক ও বিচারক নিয়োগ- সবই দুনিয়ার ইতিহাসে নজিরবিহীন। পৃথিবীর কোথাও যেখানে যুদ্ধাপরাধের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ বছর পর যুদ্ধাপরাধ তালাশের জন্য তদন্ত কমিটি হয়নি। বরং যুদ্ধের সময় বা যুদ্ধের পর পরই চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধকে সুনির্দিষ্ট করার জন্য তদন্ত কমিটি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়, তার তদন্ত যুদ্ধ শেষ হওয়ার তিন বছর আগেই ১৯৪২ সালে শুরু হয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ও যুদ্ধকালেই চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের চিহ্নিত এবং পরে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে তাদের শাস্তি দেয়া হয়। সার্বিয়ায় যে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয় তার নায়ক কারাদজিদরা যুদ্ধ চলাকালেই চিহ্নিত হয় পরে তদন্তের মাধ্যমে সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের মামলা চলে। রুয়ান্ডায় যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রেও এই ঘটনাই ঘটেছে। ভারতের ইচ্ছায় ব্যতিক্রম ঘটছে শুধু বাংলাদেশে। ১৯৭৩ সালে শুধুমাত্র পাক বাহিনীর যুদ্ধাপরাধ বিচারের জন্য যে আইন প্রণীত হয়েছিল, তার ভিত্তিতে পাক সেনাদের যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, যুদ্ধাপরাধী চিহ্নিত এবং ভারতীয় যোগসাজশে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা ও ছেড়ে দেয়ার পর সে অচল আইনকেই সচল করে তার অপপ্রয়োগের জন্য আজ উঠেপড়ে লাগা হয়েছে। এটা শুধু আইনের অপব্যবহারই নয়, দেশবাসীর বিরুদ্ধে এটা একটা ষড়যন্ত্র। দেশবাসীকে বিভক্ত, বিপর্যস্ত ও দুর্বল করার লক্ষ্যেই শত্রুদেশ ও শত্রু বাহিনীর যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে যে যুদ্ধাপরাধ আইন প্রণীত হয়েছিল, সেই আইনে দেশবাসীকে টার্গেট বানানো হয়েছে। ভারতীয় এ নীল নকশা শুধু আইনেরই অপপ্রয়োগ করছে না আইনকে বিকৃতও করেছে এবং যুদ্ধাপরাধীদের আওতা ও সংজ্ঞা পাল্টে দিয়েছে।
অভিজ্ঞমহল বলছেন, স্বাধীনতা-উত্তরকালে আন্তর্জাতিক বিধি অনুসারে পাকবাহিনী এবং তাদের সহযোগী সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যেই যুদ্ধাপরাধী তালাশ করা হয় এবং পাক বাহিনীকেই যুদ্ধাপরাধের জন্য সার্বিকভাবে দায়ী করা হয়। ৭২ সাল থেকে তদানীন্তন বাংলাদেশ সরকারের কর্তৃপক্ষীয় মহলের বক্তব্য, বিবৃতি ঘোষণা যদি সামনে রাখা হয় তাহলে এই বিষয়টিই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী কারাগার থেকে দেশে ফেরেন। ঐদিন বিকেলে রেসফোর্স (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে বিশাল সমাবেশে তিনি ঘোষণা করেন, ‘বিশ্বকে মানবাতিহাসের জঘন্যতম ঘটনার তদন্ত অবশ্যই করতে হবে। একটি আন্তর্জাতিক দল এ বর্বরতার তদন্ত করুক আমরা এটা কামনা করি। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বাংলাদেশে যে নির্বিচার গণহত্যা করেছে, তার অনুসন্ধান ও ব্যাপকতা নির্ধারণের জন্য আমি জাতিসংঘের নিকট একটা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের আবেদন জানাচ্ছি।' উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এই একবারই মাত্র আন্তর্জাতিক তদন্তের আহবান জানানো হয়েছিল। তারপর সরকারের কেউ আর দ্বিতীয়বার একথা উচ্চারণ করেনি। তবে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা অব্যাহতভাবে বলে যাওয়া হয়েছে। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং শপথ গ্রহণের পরই তিনি বলেন, ‘লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের কাহিনী আমি শুনেছি। তবুও বাংলার মানুষ এত নিচে নামবে না। বরং যা মানবিক তাই করবে। তবে অপরাধীদের আইনানুগ ব্যবস্থা করবে।' কিন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করার আগে কলাবরেটর বা দালালদের ব্যাপারে শেখ মুজিব সরকার প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালের ১৬ জানুয়ারি প্রকাশিত সরকারি এক প্রেসনোটে বলা হয়, ‘সরকার দালাল বা এ ধরনের অপরাধীদের দেখা পেলে তাদের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রেখে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অসামরিক পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে।' এর আট দিনের মাথায় ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি দালালদের দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়। পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি পেছনে পড়ে যাচ্ছে মনে করেই সম্ভবত ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ শহীদদের পরিবারবর্গের পক্ষ থেকে পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ঢাকার রাজপথে মিছিল বের হয়। মিছিল পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করে। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান জাতির উদ্দেশে দেয়া বেতার ও টিভি ভাষণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গটি আবার সামনে নিয়ে আসেন। পাক প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানে আটকে পড়া পাঁচলাখ বাঙ্গালীকে ফেরত দেয়ার বিষয়টি পাক যুদ্ধবন্ধীদের মুক্তির সঙ্গে শর্তযুক্ত করায় শেখ মুজিবুর রহমান এ ভাষণে বলেন, ‘তাদেরকে (পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙ্গালী) ফিরিয়ে দেয়া হোক। এ ইস্যুকে কোনোক্রমে যুদ্ধবন্দীদের সমপর্যায়ে ভাবা চলবে না। কারণ তাদের (পাক যুদ্ধবন্ধীদের) মধ্যে এমন অনেক আছেন যারা শতাব্দীর নৃশংসতম হত্যার অপরাধে অপরাধী। তারা মানবিকতাকে লঙ্ঘন করেছে এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার ভিত্তিতে বিচার হবে।' এ বছরই ১৬ মে শেখ মুজিবের আওয়ামী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে পাক হানাদার বাহিনীর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্দেশ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্ডিন্যান্স প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলছে।' ইতোমধ্যে কলাবরেটের আইনের অধীনে কলাবরেটর-দালালদের বিচারের কাজ শুরু হয়ে গেছে। ১৯৭২ সালের ১১ জুন চিকন আলী নামের একজন কলাবরেটরের মৃত্যুদন্ড প্রদানের খবর প্রকাশিত হয়। ৭২ সালের ২রা জুলাই কুষ্টিয়ার এক জনসভায় তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, ‘পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।' এ বছরেরই ২৯ আগস্ট আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে বলেন, ‘সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের সম্পর্কিত তদন্তের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা প্রকাশ করা হবে।' এরপর ১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল প্রকাশিত বাংলাদেশ সরকারের এক প্রেস রিলিজে বলা হয়, তদন্তের মাধ্যমে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর মধ্য থেকে ১৯৫ জনকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, জেনোভা কনভেনশনের আর্টিকেল তিন এর লঙ্ঘন, হত্যা, ধর্ষণ, লুটের অপরাধে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৯৭৩ সালের ১ জুনের এক খবরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে বলা হয়, ‘টোকিও ও নুরেমবার্গ বিচারের সময় যে মূল নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে একটি বিল পেশ করা হবে।' ৭৩ সালের ৮ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব এক সাক্ষাৎকারে জানান, ‘ইতিপূর্বে তালিকাভুক্ত পাক যুদ্ধাপরাধীদের সংখ্যা ১২০০ থেকে কমে ১৯৫ জন হয়েছে। এই ১৯৫ জন পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই।' কিন্তু পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অবশেষে হয়নি। ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল নয়াদিল্লীতে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রি-পক্ষীয় চুক্তি অনুসারে পাক যুদ্ধাপরাধীদের forget and forgive এর অংশ হিসেবে ক্ষমা ও ছেড়ে দেয়া হয়। এইভাবে পাক যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেয়ার ছয় মাস একুশ দিন পর ১৯৭৩ সালের ৩০ নবেম্বর বাংলদেশের ভেতরের যারা রাজনৈতিকভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, যারা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় খুন, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ছাড়া অন্যান্য ছোট-খাট অপরাধ করেছিল, তাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে বলেন, ‘অতীতের সমস্ত গ্লানি ভুলিয়া গিয়া পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য আমরা কোনো উদ্যোগ বাদ দেইনি এবং সর্বশেষ ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমা ঘোষণা করিয়া আমরা চূড়ান্ত অবদান রাখিয়াছি। ঐ সকল যুদ্ধবন্দি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধসহ মারাত্মক অপরাধ করিয়াছে। ইহা হইতেছে নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও উপমহাদেশে ভবিষ্যৎ শান্তি ও স্থায়িত্ব গড়িয়া তোলার পথে আমাদের অবদান।' অবশেষে ১৯৭৪ সালের শেষ মাস ১৫ ডিসেম্বর জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের প্রসঙ্গে আবারও বলেন, ‘পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের চেষ্টা আমরা করেছি, এমনকি মানবতা বিরোধী জঘন্য অপরাধের জন্য যাদের বিচার হওয়ার কথা ছিল সেসব যুদ্ধাপরাধীরও আমরা মার্জনা করে দিয়েছি। বাংলার মানুষের বদান্যতা ও ঔদার্য ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।'
স্বাধীনতা-উত্তর মুজিব সরকারের উপরোক্ত বক্তব্য, বিবৃতি ও ঘোষণায় এ কথা পরিষ্কার যে, ১৯৭৩ সালের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল এ্যাক্ট প্রণীত হয়েছিল শুধুই যুদ্ধাপরাধের (এর সাথে মানবতা বিরোধী ধারাও যুক্ত) বিচারের জন্য এবং এ যুদ্ধাপরাধীরা ছিল পাক সেনাবাহিনীর সদস্য। আর অপরাধমূলক কাজের সাথে যুক্ত বাংলাদেশীদের বিচারের জন্যে করা হয়েছিল দালাল আইন। কিন্তু এখন শত্রু বাহিনীর যুদ্ধাপরাধীদের জন্যে প্রণীত ১৯৭৩ সালের আইনকে স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর বাংলাদেশের অসামরিক ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে প্রয়োগের সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ করা হয়েছে। যে আইনটি একটি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেয়া এবং যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়ী একটা বিদেশী বাহিনীর বিচারের জন্য প্রণীত হয়েছিল সেই আইনকে বাংলাদেশের অসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয় ১৯৭৩ সালের আইনটিকে আন্তর্জাতিক আইন ও বিধির তোয়াক্কা না করে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে করে যাকে ইচ্ছা তাকে অভিযুক্ত করে শাস্তি দেয়া যায়। অতএব এর মাধ্যমে একদিকে ১৯৭৩ সালের আইনের অপব্যবহার করা হচ্ছে, অন্যদিকে এ কালাকানুনকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বনদ্বী শক্তি ও ব্যক্তিকে দমনের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে।
এই বিষয়গুলোকে সামনে রেখে পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, এ আইনটির প্রয়োগ যেমন বৈধ নয়, তেমনি আইনটিও জঘন্য একটি কালাকানুন, যার উদ্দেশ্য যথেচ্ছভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা। তারা আরও বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে যুদ্ধাপরাধ ইস্যুটি মইন-উ-আহমদের মাধ্যমে ভারতই সৃষ্টি করেছে। তাদের উদ্দেশ্য আরও ভয়াবহ। তারা এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কার্যকর ইসলামী শক্তিকে নির্মূল করতে চায়। যাতে করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার শক্তি দুর্বল হয়। ভারত মনে করে, ভারতের লক্ষ্য হাসিলের পথে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হলো মুসলিম জাতিসত্তার অতন্দ্র প্রহরী ইসলামী শক্তি, যারা জীবনের বিনিময়ে হলেও বাংলাদেশের স্বতন্ত্র রাষ্ট্রসত্তাকে রক্ষা করতে চায়। সংগঠিত ইসলামী শক্তির মধ্যে জামায়াতে ইসলামী অগ্রগণ্য বলেই জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রধান টার্গেট। আমাদের আইন প্রতিমন্ত্রী যখন বলেন, গোটা জামায়াতে ইসলামী যুদ্ধাপরাধী, তখন বোঝা যায় জামায়াতের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্বেষ কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। এই বিদ্বেষ ১৯৭১ সালের জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কারণে সৃষ্টি হয়নি অবশ্যই। কারণ ১৯৭১ সালে জামায়াত ছিল একটি ক্ষুদ্র দল। জামায়াতের তুলনায় মুসলিম লীগ ছিল শতগুণে বড় দল। যেহেতু জামায়াত ছোট দল ছিল সেহেতু ১৯৭১ সালে তাদের ভূমিকাও খুবই নগণ্য ছিল। শান্তি কমিটি, রাজাকার ইত্যাদি সংগঠন ও বাহিনীর তালিকা দেখলে বোঝা যাবে জামায়াতের উপস্থিতি সেখানে নেই বললেই চলে। তাহলে জামায়াতে ইসলামীকে যুদ্ধাপরাধী সাজাবার সীমাহীন বিদ্বেষ ও মহা আয়োজন কেন? উত্তর একটাই সেটা হলো, ভারতের এটাই ইচ্ছা। ভারতীয় বিশ্লেষকরা, ভারতীয় সাংবাদিকরা, ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা জামায়াতের বিরুদ্ধে অবিরাম বিষোদগার করে আসছে। অথচ বাংলাদেশের একটি ছোট দল হিসেবে জামায়াতের বিরুদ্ধে ভারতের এ বিষোদগারের কোনো হেতু নেই। হেতু থাকলে সেটা এটাই যে, জামায়াত বাংলাদেশে মুসলিম জাতিসত্তার উজ্জীবন ও রক্ষায় বিশ্বাসী। কারণ জামায়াত নিশ্চিত বিশ্বাস করে বাংলাদেশের মানুষের মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধ যতদিন থাকবে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র রাষ্ট্রকাঠামোর যৌক্তিকতা ততদিন জীবন্ত ও অজেয় থাকবে। জামায়াতের এই বিশ্বাস ভারতের জনগণ নয় ভারতের এক শ্রেণীর শাসকদের চক্ষুশূল।
এসব বিবেচনা সামনে রেখে অভিজ্ঞ মহলের অভিমত এই যে, যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে যারা বাংলাদেশের জনগণকে বিভক্ত করে দুর্বল ও অসহায় করে তুলতে চাচ্ছে, তাদের মুখোশ অচিরেই খুলে যাবে। যুদ্ধাপরাধ শব্দের অপব্যবহার করা, যুদ্ধাপরাধ আইনের অপপ্রয়োগ করা, যুদ্ধাপরাধ আইনকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের কালাকানুনে পরিণত করা, এসবের পিছনে বাইরে থেকে যারা কলকাঠি নাড়ছে তাদের বদ মতলব সবই মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু নানা রাখঢাক করে, নানা শোরগোল তুলে একশ্রেণীর মিডিয়াকে বশংবদ বানিয়ে সরকার এই সত্যগুলোকে আড়াল করতে চাচ্ছে। কিন্তু সত্য তার আপন শক্তিতেই মানুষের সামনে এসে যাবে। ইতোমধ্যেই তার লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত পরশু একটি মানবাধীকার সংগঠন কর্তৃক আয়োজিত সম্মেলনে আইনজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের সত্যভাষণ এরই একটি দৃষ্টান্ত।
Saturday, April 3, 2010
যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে সরকার নানা আইনী ও নৈতিক প্রশ্নের জালে জড়িয়ে
যুদ্ধাপরাধের কথিত বিচার নিয়ে সরকার লেজে-গোবরে দশায় পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সরকারের মন্ত্রীদের উল্টা-পাল্টা কথা, উল্টা-পাল্টা সিদ্ধান্ত, ট্রাইব্যুনাল, তদন্ত কমিটি ও প্রসিকিউশনের জন্য মনোনীত লোকদের নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়া, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সরকার বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধ এবং যুদ্ধকালীন সময়ে বিভিন্ন অপরাধের তদন্ত ও বিচার যে স্বাধীনতা উত্তরকালে একবার হয়ে গেছে, এই বিষয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ার পর যুদ্ধাপরাধের বিচারের সরকারি নতুন উদ্যোগকে দেশের ভিতর ও বাইরে সবাই বিরোধী দল বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীকে দমনের একটা নীলনক্সা বলে মনে করতে শুরু করেছে। তাছাড়া যুদ্ধাপরাধের বিচার আইন নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি। ১৯৭৩ সালের এই আইনটি গত বছর একদফা সংশোধনের পরও আন্তর্জাতিক আইনে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এই বিষয়টিকে সরকার মোটেই গুরুত্ব দিচ্ছে না। এই মানসিকতা অব্যাহত থাকলে গোটা বিচারই প্রহসনে পরিণত হবে কিংবা গোটা বিচার আন্তর্জাতিকভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে। এসব বিষয় সরকারি মহলকে সাংঘাতিকভাবে আলোড়িত করছে। সরকারি মন্ত্রীদের আবোল-তাবোল বক্তব্য এরই একটা বহিঃপ্রকাশ বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন।
যুদ্ধাপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচার বিষয়ে অভিজ্ঞ মহল বলছেন, এক বিচার দুইবার হয় না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর যুদ্ধাপরাধ বিষয়ে তদন্ত ও যুদ্ধাপরাধের বিচার স্বাধীনতাউত্তর শেখ মুজিব সরকার সম্পন্ন করে গেছেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়ী পাকিস্তানী সৈন্য এবং সহযোগী মিলিশিয়া, পুলিশ, রাজাকার, আল-বদর ইত্যাদি বাহিনীর যুদ্ধাপরাধ তদন্তের জন্য গঠিত কমিটি তদন্ত শেষে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে চিহ্নিত করে। তদানিন্তন শেখ মুজিব সরকার ১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল একটি সরকারি ঘোষণায় এই চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা ঘোষণা করে। কিন্তু তাদের বিচার হয়নি। ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল দিল্লীতে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান এই ত্রিপক্ষীয় এক চুক্তির মাধ্যমে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে মাফ করে দেয়া হয় এবং ছেড়ে দেয়া হয়, যাতে বলা হয়- "the Prime Minister of Pakistan had declared that he would visit Bangladesh in response to the invitation of the Prime Minister of Bangladesh and appealed to the people of Bangladesh to forgive and forget the mistakes of the past in order to promote reconciliation. Similarly, the Prime Minister of Bangladesh had declared with regard to the atrocities and destruction committed in Bangladesh in 1971 that he wanted the people to forget the past and to make a fresh start, stating that the people of Bangladesh knew how to forgive."
এইভাবে ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে "forgive & forget" করার মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধ বিচার ইস্যুর ইতি ঘটানো হয়।
এরপর নতুন করে যুদ্ধাপরাধ বিচারের কথা বলার, উদ্যোগ নেয়ার, ট্রাইব্যুনাল গঠনের আইনি ও নৈতিক অধিকার কারও নেই। যারা জার্মান-নাজী যুদ্ধাপরাধীদের চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর বিচারের দৃষ্টান্ত তুলে বলেন সেভাবে আমরাও বিচার করতে পারি। একথা যারা বলেন তারা হয় গন্ডমূর্খ, না হয় তারা সত্য গোপনকারী। নাজী যুদ্ধাপরাধীদের মধ্যে পলাতক কারও কারও বিচার চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর পর হলেও তাদের অপরাধ চিহ্নিত হয়েছিল ১৯৪৫ সালের আগেই তদন্তের মাধ্যমে। তাদের বিরুদ্ধে কেসও দায়ের হয়েছিল ১৯৪৫ সালেই নুরেমবার্গ আদালতে। শুধু পলাতক থাকার কারণেই বিচার ও শাস্তি হতে পারেনি। যখনই ধরা পড়েছে, তাদের বিচার হয়েছে সেই চিহ্নিত অপরাধ ও মামলা অনুসারে। এ রকম কোন বিষয় বাংলাদেশে নেই। ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী চিহ্নিত হয়েছিল। তাদের সবাইকেই শেখ মুজিব সরকার ছেড়ে দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। অতএব বিচারের জন্য অবশিষ্ট কোন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী বাংলাদেশে নেই।
অভিজ্ঞ মহল বলছেন, মাত্র একটা উপায়েই নতুন করে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত ও যুদ্ধাপরাধের বিচার হতে পারে। সে উপায়টা হলো, শেখ হাসিনার সরকার শেখ মুজিব সরকারের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত বাতিল করতে হবে এবং নতুন করে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য নতুন করে যুদ্ধাপরাধ তদন্তের ঘোষণা দিতে হবে। সেক্ষেত্রে ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিলের ত্রিপক্ষীয় দিল্লী চুক্তিকে বাতিল করে দিয়ে ৯৩ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যকে বাংলাদেশে ফেরত আনতে হবে এবং পাক সেনা ও তাদের সহযোগী বাহিনীর মধ্যে কারা যুদ্ধাপরাধী তা চিহ্নিত করার জন্য তদন্ত শুরু করতে হবে।
স্বাধীনতাউত্তর শেখ মুজিব সরকারের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত ও ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা বাতিল, ৯৩ হাজার পাকিস্তানী সৈন্য ফেরত আনা ছাড়া শেখ হাসিনা সরকার নতুন করে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত করা সম্ভব নয়।
সম্ভবত এই বিষয়টি দেরিতে হলেও সরকারের নজরে এসেছে। তারা বুঝতে পেরেছে, যুদ্ধাপরাধের বিচার করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এই জন্যই তারা এখন শ্লোগান তুলেছে যুদ্ধাপরাধের নয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের তারা বিচার করবে।
কিন্তু অভিজ্ঞ মহলের দৃঢ় অভিমত হলো, যে কারণে সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে পারবেন না; সেই একই কারণে সরকার '৭১ সালের যুদ্ধকালীন মানবতা বিরোধী অপরাধেরও বিচার করতে পারবেন না। কারণ ১৯৭৩ সালের বাংলাদেশী যুদ্ধাপরাধ আইন ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আইন অনুসারে মানবতা বিরোধী অপরাধও যুদ্ধাপরাধ আইনেরই একটা অংশ। ১৯৭৩ সালের আইনের ৩ ধারার ২ উপধারায় A B C D এই চার হেডে চারটি অপরাধের কথা বলা হয়েছে। A-তে রয়েছে ‘ক্রাইম এগেনস্ট হিউম্যানেটি, B-তে ‘ক্রাইম এগেনস্ট পিস', C-তে জেনোসাইড' এবং D-তে ‘ওয়ারক্রাইমস'। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, একই আইনের অংশ। এই আইনের অধীনেই তদন্ত করে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তারপর তাদের ক্ষমা করে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিয়ে যুদ্ধাপরধ ইস্যুর অবসান ঘটানো হয়েছে। সুতরাং এই আইনের (১৯৭৩) অধীনে পরিচালিত সেই সময়ের তদন্ত, ক্ষমা ইত্যাদি বাতিল না করে এই আইনে নতুন কোন তদন্ত হতে পারে না। অবশ্য অভিজ্ঞ মহলের মতে ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন টাইম-ফ্রেম বাদ দিয়ে অন্য সময়ের মানবতার বিরুদ্ধে অর্গানাইজড কোন অপরাধের বিচার নতুন কোন আইনে অবশ্যই হতে পারে।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে যুদ্ধাপরাধ আইনের পাশাপাশি শেখ মুজিব সরকার কলাবরেটর এ্যাক্ট নামে আরেকটা আইন করেছিলেন। পাকিস্তান আর্মি ও তাদের সহযোগী অর্গানাইজ বাহিনীর বাইরের যারা স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগের মত অপরাধ করেছিল, তাদের বিচার করার জন্য এই আইন প্রণীত হয়েছিল।
১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি ‘দালাল আইন' জারি করা হয়। এই আইনের অধীনে প্রায় ১ লাখ লোককে গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্য থেকে অভিযোগ আনা হয় ৩৭ হাজার ৪শ' ৭১ জনের বিরুদ্ধে। এই অভিযুক্তদের মধ্যে ৩৪ হাজার ৬শ' ২৩ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষী-প্রমাণের অভাবে কোনো মামলা দায়েরই সম্ভব হয়নি। ২ হাজার ৮শ ৪৮ জন বিচারে সোপর্দ হয়। বিচারে ৭শ' ৫২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয় এবং অবশিষ্ট ২ হাজার ৯৬ জন বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। ১৯৭৩ সালের ৩০ নবেম্বর শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশ সরকার সধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। দেখা যাচ্ছে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করার পর কলাবরেটর আইনটিও অচল হয়। যদিও সাধারণ ক্ষমার বাইরে হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ এই কয়েকটি অপরাধের বিচারের দ্বার উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ ক্ষমা পরবর্তী শেখ মুজিবের দেড় বছর এবং পরে জিয়াউর রহমানের সাড়ে চার মাসে এই সব অভিযোগে কলাবরেটর আইনের অধীনে একটি মামলাও দায়ের হয়নি। এই অবস্থায় বিশেষ আইনটি আপনিই অচল হয়ে পড়ে। এই অচল আইনটিকেই জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে আইনিভাবে অচল করে দেন মাত্র।
সুতরাং কলাবরেটর আইনের অধীনেও শেখ হাসিনার সরকার জামায়াত নেতা কিংবা কারও বিরুদ্ধে কোন মামলা দায়ের করতে পারছে না। অবশ্য এই কলাবরেটর বা দালাল আইন যুদ্ধাপরাধ আইনের মত পাকিস্তান বাহিনী ও তাদের সহযোগী বাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। যুদ্ধাপরাধ আইনের বাইরে দেশীয় লোকদের বিচারের জন্য এই আইন করা হয়েছিল। অতএব এই আইন পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। কিন্তু সরকারের জন্য সমস্যা হলো, আইন পুনরুজ্জীবিত হলেই মামলা পাওয়া যাবে না। কারণ জামায়াতের যাদেরকে রাজনৈতিক ময়দান থেকে সরানোর খুব ইচ্ছা সরকারের, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের নেই। কিংবা যারা দালাল আইনের অধীনে গ্রেফতার হয়েছিল, যারা বিচারে সোপর্দ হয়েছিল, যারা শাস্তি পেয়েছিল-- তাদের কারও মধ্যেই এই জামায়াত নেতারা নেই। সুতরাং দালাল আইনে জামায়াত নেতা বা কাউকে বিচারে আনতে হলে নতুন করে মামলা আনতে হবে। কিন্তু সরকারের সমস্যা হলো, এই মামলা সরকার কোথায় পাবেন। যাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা শেখ মুজিবের সাড়ে তিন বছরে হলো না, জিয়াউর রহমানের সাড়ে চার মাসে হলো না, তাদের বিরুদ্ধে কেস আসবে কোত্থেকে! এই অবস্থায় কেস সাজানো ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু ৩৯ বছরের আগের ঘটনার ওপর সাজানো কেস ধরা পড়ার সম্ভাবনাই শতভাগ। কারণ আসামী থেকে বিচারক সবাই এসব কেসের মধ্যে রাজনৈতিক মোটিভই আগে খুঁজবে।
সুতরাং যুদ্ধাপরাধ আইনে বিচার এবং দালাল আইনে মামলা নিয়ে সামনে এগুনো সরকারের জন্য যৌক্তিক নয়, নিরাপদ নয়। তবু সরকার মনে করছে আন্তর্জাতিক মহলের অজ্ঞতা বা তাদের নীরবতার সুযোগ নিয়ে ১৯৭৩ সালের আইনে যুদ্ধাপরাধের বিচারের শ্লোগান নিয়ে এগুতে পারে। কিন্তু সরকারের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক আইন। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ আইনে প্রবল কিছু অসংগতি আছে যা দূর না হলে বিচার গ্রহণযোগ্য হবে না।
সম্প্রতি ‘ইন্টারন্যাশনাল বার এসোসিয়েশনের ওয়ার ক্রাইমস' কমিটি বাংলাদেশী আইনের ওপর যে রিকোমেন্ডেশন দিয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে ১৭ দফা সংশোধন ছাড়া বাংলাদেশের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস এ্যাক্ট আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না। উল্লেখ্য, বৃটিশ পার্লামেন্টের ‘হিউম্যান রাইটস' গ্রুপ বাংলাদেশের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনাল) এ্যাক্ট পর্যালোচনা করে দেখার জন্য ইন্টারন্যাশনাল বার এসোসিয়েশনের ওয়ার ক্রাইমস কমিটিকে অনুরোধ করেন। তাদের এই অনুরোধে ওয়ার ক্রাইমস কমিটি বাংলাদেশের আইনটি পর্যালোচনা করে একটা রিকোমেনডেশন তৈরি করে। তাদের ১৭ দফা রিকোমেনডেশনের প্রথমটি ওয়ার ক্রাইমস-এর সংজ্ঞা নিয়ে। বাংলাদেশ আইনে ‘ক্রাইমস এগেইন্স্ট পিস' এবং ‘ক্রাইমস এগেইন্স্ট হিউম্যানিটি' এই দুই বিষয়ের সংজ্ঞাকে ওয়ার ক্রাইমস কমিটি তাদের রিকোমেন্ডেশনে বিতর্কিত বলে অভিহিত করে এবং আন্তর্জাতিক বিধি অনুসারে একটি সংশোধনী প্রস্তাব করে। বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ আইনের চতুর্থ ধারায় উল্লেখিত ‘কমান্ডার অর সুপিরিয়র অফিসার' শব্দগুলোর ‘সুপিরিয়র অফিসার'-এর ব্যবহার ও সংজ্ঞা নিয়ে আন্তর্জাতিক বার এসোসিয়েশনের ওয়ার ক্রাইমস কমিটি আপত্তি উত্থাপন করে বলেন, এটা আন্তর্জাতিক ‘Rome Statute' -এর আর্টিকেল ২৮-এর পরিপন্থী। তারা এ ব্যাপারেও দুটি সংশোধনী প্রস্তাব করে। বাংলাদেশ আইনে যুদ্ধাপরাধের বিচারকালীন কোনো বিচারপতির অনুপস্থিতি বিষয়ে যে বিধান রাখা হয়েছে আন্তর্জাতিক বারের ওয়ার ক্রাইমস কমিটি তাকে যুদ্ধাপরাধ বিচারের চলমান পদ্ধতির খেলাফ এবং ট্রাইব্যুনালের স্বচ্ছতার পরিপন্থী বলে আখ্যায়িত করে তাদের রিকোমেন্ডেশনে তারা বলেছেন, কোনো বিচারপতি অনুপস্থিত থাকলে বিচার অবশ্যই স্থগিত রাখতে হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আইনে ট্রাইব্যুনালের বিচারক বা চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো আপত্তি তোলার কারো কোন সুযোগ নেই। ওয়ার ক্রাইমস কমিটি এই বিধানের বিরোধিতা করে বলেছেন, ট্রাইব্যুনালকে অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে এবং নিরপেক্ষতার ব্যাপারে কোনো পক্ষ কোনো প্রশ্ন তুললে তাকে অবশ্যই আমলে নিতে হবে। বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিচার আইনে তদন্ত পদ্ধতি সংক্রান্ত অষ্টম অনুচ্ছেদের ৫ ও ৭ উপধারা এবং ১৮ উপধারাকে তারা বাতিল করতে বলেছেন। ১১ (২) উপধারাকে আন্তর্জাতিক বিধি অনুসারে সংশোধন করতে বলা হয়েছে। তাছাড়া আসামী এবং সাক্ষীর আত্মস্বীকৃতির বিষয়টিকে আইনের মাধ্যমে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করতে বলা হয়েছে। ১০ নম্বর ধারার ১০ (১) (D) উপধারাকে সংশোধনের কথা বলেছে কমিটি। বাংলাদেশ আইনের ১২ ধারার আসামী পক্ষের আইনী প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিকে সংশোধন করে একটা সংশোধনী তারা সাজেস্ট করেছেন। ২০ (২) উপধারার মৃত্যুদন্ডের বিধান সম্পর্কে দ্বিমত পোষণ করে তারা এই উপধারা বাতিল করার কথা বলেছেন। অনুরূপভাবে তারা আপিল সংক্রান্ত ২১ ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করেছেন। আন্তর্জাতিক বার এসোসিয়েশনের ওয়ার ক্রাইমস কমিটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংশোধনী, সাক্ষী আইন বিষয়ক বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ আইনে পত্রপত্রিকার রিপোর্ট, ফটোগ্রাফ, ফিল্ম, টেপরেকর্ডিং এবং এই ধরনের বিষয়কে বৈধ সাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। ওয়ার ক্রাইমস কমিটি আমাদের এই আইনের সাথে দ্বিমত পোষণ করে এই বিধানকে বাতিল করতে বলেছে। সুতরাং যুদ্ধাপরাধ বিচারকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে হলে সরকারকে অবশ্যই যুদ্ধাপরাধ আইনের ১৯ (১) ধারাকে আইন থেকে বাদ দিতে হবে। ওয়ার ক্রাইমস কমিটি তাদের সর্বশেষ রিকোমেন্ডেশানে বাংলাদেশের মামলা পরিচালনা বিষয়ক প্রসিকিউশনের দায়িত্ব ও ক্ষমতা সংক্রান্ত ‘Rome Statute'-এর ৫৪ নং আর্টিকেল এবং তদন্তকালীন সন্দেহভাজন ব্যক্তির অধিকার সংক্রান্ত ‘Rome Statute'-এর ৫৫নং আর্টিকেলকে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস এ্যাক্ট ১৯৭৩-এর সাথে যুক্ত করতে বলেছে। আন্তর্জাতিক বার এসোসিয়েশনের ওয়ার ক্রাইমস কমিটির এই সব রিকোমেন্ডেশন সরকারের প্রণীত আইনকে অনেকটাই লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও গত ১৯ মার্চ যুদ্ধাপরাধের আন্তর্জাতিক আইন ‘Rome Statute' বাংলাদেশ র্যা ক্টিফাই করার পর এই আইনকে উপেক্ষা করার কোন সুযোগ সরকারের কাছে নেই। এই অবস্থায় সরকার এখন উভয় সংকটের মুখোমুখি। একদিকে যুদ্ধাপরাধের বিচার করার আইনি ও নৈতিক সুযোগ বাংলাদেশের নেই, অন্যদিকে আইনের উপরোক্ত সংশোধনী মানলে যে ধরনের বিচার করতে হবে তাতে সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির সম্ভাবনা কম। এই অবস্থায় শীর্ষ পর্যায়সহ সরকারের একটি মহল যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কোনওভাবে এড়িয়ে যাওয়াকে বেহতের মনে করছেন। ‘যুদ্ধাপরাধ' থেকে ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ'-এ শিফট এই মানসিকতারই একটা প্রমাণ।
Wednesday, March 31, 2010
যারা যুদ্ধাপরাধী পাক-সেনাদের ছেড়ে দিয়েছিল তারাই আজ নির্দোষদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধী খুঁজতে মরিয়া
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার উদ্যোগী হলেও অন্তরালের একটি শক্তি পিছন থেকে সব কিছু করার ব্যাপারে মরিয়া বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। অন্তরালের এ শক্তি আমাদের প্রতিবেশী দেশটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রহস্যজনকভাবে গঠিত হওয়া কিছু সংগঠনের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যু নিয়ে আন্দোলন শুরু করে। উল্লেখ্য আমাদের প্রতিবেশী ভারতই ১৯৭৩ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ের মূল যুদ্ধাপরাধী যারা, তাদেরকে বিনা বিচারে বিনা শাস্তিতে ছেড়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। ভারতই মূল যুদ্ধাপরাধী ১৯৫ জন সেনা অফিসারকে ছেড়ে দেয়ার পর এখন নতুন করে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে একটা জটিলতা ও সংকটের দিকে বাংলাদেশকে ঠেলে দিয়েছে। অভিজ্ঞ মহলের মতে, ভারতীয় এ অভিসন্ধির লক্ষ্য হলো একটি বিভেদমূলক ইস্যুতে বাংলাদেশের মানুষকে জড়িত করা, তার মাধ্যমে এদেশে দেশপ্রেমিক শক্তিকে দুর্বল করা এবং ভারত বন্দর, করিডোর, গ্যাস ইত্যাদিসহ যা চায় তা পাওয়াকে নিরুপদ্রব করা।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক সেনারা ঢাকায় আত্মসমর্পণের পর ভারত এ দেশের মানুষকে অবাক করে দিয়ে আত্মসমর্পিত পাকসেনা ও মিলিশিয়াসহ ৯৩ হাজার সৈন্য ভারতে নিয়ে যায়। বন্দী পাক সেনাদের এই অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তদানীন্তন শেখ মুজিব সরকার যুদ্ধাপরাধের তদন্ত করে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে চিহ্নিত করে, যারা সকলেই বন্দী সেনা ও সেনা কর্মকর্তা ছিল। যুদ্ধাপরাধীদের চিহ্নিত করার পর ১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ঘোষণা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি ঘোষণা করে এবং ১৯৭৩ সালের মে মাসের শেষের দিকে তদন্তের দ্বারা চিহ্নিত ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে বিচারিক ট্রাইব্যুনালের কছে হাজির করার কথা ছিল। কিন্তু ভারতের যোগসাজসেই এবং বাংলাদেশের সম্মতিতে বিচার ও শাস্তি না দিয়ে ভারত থেকে যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেয়া হয়। এই ভাবেই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে ছেড়ে দেয়ার মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুর ইতি ঘটে। পাক-সেনা ও পাক-যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেয়ার পর অবশিষ্ট রাজাকার, আলবদর, আল সামস ইত্যাদি সহযোগী বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধাপরাধী খোঁজার প্রশ্ন ওঠেনি। কারণ ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করার সময় তদন্তের আওতায় এসব সহযোগী বাহিনীও ছিল। সব বাহিনীকে বিবেচনায় এনে চূড়ান্তভাবে ১৯৫ জনকে যুদ্ধাপরাধী চিহ্নিত করা হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে ১৭ এপ্রিলে যুদ্ধাপরাধীদের চিহ্নিত করা ও বিচার সংক্রান্ত সরকারের ঘোষণায় বলা হয়েছিল, "Investigations into the crimes committed by the Pakistan occupation forces and their auxiliaries are almost complete. Upon the evidence, it has been decided to try 195 persons of serious crimes, which include genocide, war crime, crimes against humanity, breaches of Article-3 of the Geneva Conventions, murder, rape and arson."
এ ঘোষণায় দেখা যাচ্ছে পাকিস্তান ও ‘পাক সেনা' ও তার 'auxiliaries' বা সহযোগী বাহিনীর মধ্য থেকে ১৯৫ জনকে যুদ্ধাপরাধী চিহ্নিত করা হয়েছিল। এই ভাবেই শেখ মুজিব সরকার যুদ্ধাপরাধী ইস্যুর ইতি ঘটিয়েছিলেন। এরই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি ছিল সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা। তবে খুন, ধর্ষণ লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ এই চার অপরাধের অপরাধীদের ক্ষমা করা হয়নি। কলাবরেটর এ্যাক্টের অধীনে এদের বিচারের ব্যবস্থা উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল। কিন্তু এ বিষয়টা যুদ্ধাপরাধের বিচারের বাইরে। যুদ্ধাপরাধ ইস্যুকে মূল যুদ্ধাপরাধী পাক-সেনাদের ছেড়ে দেবার পরই ইতি ঘটানো হয়।
কিন্তু ইতি ঘটানো ইস্যুটিকে ভারত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তদানীন্তন সেনাপ্রধান মইনুদ্দিন গং-এর মাধ্যমে পুনরায় জিন্দা করার উদ্যোগ নেন। রহস্যজনকভাবে গঠিত সেক্টরস কমান্ডার ফোরাম যেন এই ইস্যুটিকেই জিন্দা করার দায়িত্ব গ্রহণ করে। অথচ এর আগে দীর্ঘ ৩৪ বছরেও যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে কেউ এভাবে আন্দোলনে নামেনি।
তাহলে এ ৩৪ বছর পর যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যু কেন উঠলো। এ প্রশ্নটিকে অভিজ্ঞমহল খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। বিশেষ করে ১/১১ পরবর্তী সরকারের আমলে এর উদ্ভব ঘটায় ১/১১ এর উদ্দেশ্যের সঙ্গে একে ব্র্যাকেটেড করা হচ্ছে। ১/১১ এর একটি লক্ষ্য ছিল চারদলীয় জোটকে ক্ষমতায় আসতে না দেয়া, এর আরো একটি লক্ষ্য ছিল ভারত বান্ধব সরকারকে ক্ষমতায় এনে বাংলাদেশের কাছ থেকে করিডোর, বন্দর ইত্যাদি আদায় করে নেয়া। যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যুটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সৃষ্টি করায় মনে করা হচ্ছে ১/১১-এর উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়িত করাও এ ইস্যুর একটি উদ্দেশ্য। ১/১১-এর কিছু ইস্যু রাজনীতিকদের দমন করতে না পারায় ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু ভারত বান্ধব সরকারকে ক্ষমতায় আনতে সফল হওয়া এবং ভারতের সঙ্গে বন্দর ও করিডোর দেয়ার মত গুরুত্বপূর্ণ কিছু চুক্তি ও সমঝোতা সম্পাদিত হওয়ার ফলে ১/১১-এর মূল উদ্দেশ্য সাধিত হওয়ার পথে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যু এই উদ্দেশ্য সাধনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলেই অভিজ্ঞমহল মনে করছে। ভারতীয় পত্র-পত্রিকার মতামতও এ বক্তব্যকে সমর্থন করছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি দিল্লীর সাথে চুক্তি ও সমঝোতা সম্পাদনের মাধ্যমে আমাদের বন্দর, করিডোর, আমাদের মার্কেটসহ, আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সমঝোতা করে আসার পর ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় দ্রুত চুক্তি ও বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে লিখেছিল শেখ হাসিনা যত সহজে নির্বাচনে বিজয় লাভ করেছেন, রাজপথে বিজয় লাভ ততটা সহজ হবে না। ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় বলা হয়েছিল জামায়াত-বিএনপিদের জোট নির্বাচনে হারলেও রাজপথের আন্দোলনে তাদের হারানো ততটা সহজ নয়। এই ক্ষেত্রে জামায়াত-বিএনপি যৌথ শক্তিকে এর কারণ হিসেবে দেখিয়েছিল।
পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, এই রাজপথের আন্দোলনকে দমন করার লক্ষ্যেই যুদ্ধাপরাধ ইস্যুর মাধ্যমে জামায়াতকে যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে জড়াবার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়া জামায়াতকে যুদ্ধাপরাধ ইস্যুর সাথে জড়াবার আর কোন কারণই পর্যবেক্ষক মহল খুঁজে পাচ্ছেন না। প্রথমত, তারা বলছেন জামায়াতের যেসব নেতাকে নিয়ে মহা হৈচৈ বাঁধানো হয়েছে তারা কেউই ১৯৭১ সালে জামায়াতের নেতা-কর্মী ছিলেন না। তারা সবাই ছিলেন ছাত্র। শান্তি কমিটির নেতা, সদস্য এবং সেই সময়ের সরকার কর্তৃক গঠিত রাজাকারের মতো বাহিনীগুলোর গঠনকারী যারা, নেতা যারা, তাদেরকে বাদ দিয়ে সেই সময়ের নেহায়েত ছাত্রদের টেনে আনা হচ্ছে কেন। এখন তারা জামায়াতের নেতা হওয়া ছাড়া এর পেছনে অন্য কোন কারণই নেই। জামায়াতকে দমন, দুর্বল করার জন্যই সেই সময়ের ছাত্র এখনকার জামায়াত নেতা হিসেবে এদেরকে টার্গেট করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, তারা বলছেন ছাত্র হলেও কেউ অপরাধ করতে পারেন। কিন্তু যেসব জামায়াত নেতাকে টার্গেট করা হচ্ছে তাদের সেই ধরনের কোন অপরাধ নেই। স্বাধীনতা-উত্তর সাড়ে তিন বছর আওয়ামী শাসনকালে দেশের কোন থানায় তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা দায়ের নেই। স্বাধীনতা-উত্তরকালে সন্দেহভাজন হিসেবে অপরাধী হিসেবে যে হাজার হাজার লোককে ধরা হয়েছিল তাদের মধ্যে এদের নাম নেই। বিভিন্ন অপরাধে সেই সময় গোটা দেশ থেকে যাদের বিচারে সোপর্দ করা হয়েছিল, যাদের শাস্তি হয়েছিল তাদের মধ্যেও তারা নেই। তাহলে কেন, কোন্ যুক্তিতে যুদ্ধাপরাধের সাথে যুক্ত করে হৈচৈ করা হচ্ছে এবং তাদের নামের তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে?
পর্যবেক্ষক মহল আরও বলছেন, ১৯৭০-৭১ এ যেসব রাজনৈতিক দল মাঠে ছিল তাদের মধ্যে প্রসার ও প্রভাবের দিক দিয়ে জামায়াতে ইসলামী ছিল একটি ছোট দল। সেই সময়ের পুরনো ও পরিচিত দলের মধ্যে আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগ, মস্কোপন্থী ন্যাপ, পিকিংপন্থী ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি প্রধান ছিল। অন্যদিকে গ্রাম, ইউনিয়ন, থানা তো দূরের কথা বড় অনেক শহরেও জামায়াতের উপযুক্ত সাংগঠনিক কাঠামো ছিল না। নেতা-কর্মী ছিল আঙ্গুলে গোনা। সুতরাং তদানীন্তন সামরিক সরকারের প্রশাসন দ্বারা গঠিত রাজাকারসহ অন্যান্য অর্গানাইজড বাহিনীতে আওয়ামী লীগ-মুসলিম লীগসহ এ ধরনের বড় দলের লোকরাই থাকার কথা এবং ছিল। দেশব্যাপী শান্তি কমিটি, আল-বদর, রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ করলেই এটা বুঝা যাবে। সুতরাং এ দিক দিয়েও যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে হৈচৈ করার কিছু নেই।
আসলে জামায়াতে ইসলামীকে সেদিনের অপরাধে নয়, আজকের অপরাধেই যুদ্ধাপরাধের ইস্যুতে ভিকটিম বানানো হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর অপরাধ হলো জামায়াত আজ ইসলামের আদর্শবাদী একটি শক্তিশালী দল। জামায়াত এককভাবে ক্ষমতায় যেতে না পারলেও বড় দলগুলোর কে ক্ষমতায় যাবে তা নির্ধারণে জামায়াত একটি ফ্যাক্টর। জামায়াত ১৯৯১ সালে বিএনপিকে ক্ষমতায় যেতে সাহায্য করেছিল। ১৯৯৬ সালে জামায়াত বিএনপি থেকে সরে আসায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যেতে পেরেছিল। আবার ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় যায়। এ যোগ্যতাই জামায়াতের অপরাধ। তার উপর জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলন দেশে ইসলামী জাগরণ সৃষ্টিতে, মুসলমানদের তাদের স্বার্থ সম্পর্কে সচেতন রাখার ক্ষেত্রেও একটা বড় ফ্যাক্টর। জামায়াতের এ যোগ্যতাই অনেকের জন্য বিশেষ করে ভারতের জন্য চক্ষুশূল। মুসলমানরা তাদের জাতিসত্তা সম্পর্কে সচেতন থাকলে সেটা ভারতের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির পথে বড় বাধা। এই বাধা দূর করার জন্যই জামায়াত নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অমূলক, অসঙ্গত, অসত্য অভিযোগ এনে জামায়াতকে দুর্বল, পারলে নির্মূল করতে চায়। যুদ্ধাপরাধ ইস্যু দিয়ে জামায়াত নেতাদের হেনস্থা এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধ করার জন্য জামায়াতের আন্দোলন নির্মূল করতে চায়। ভারতের এ আয়োজন তার এদেশীয় কতগুলো শিখন্ডীকে ভর করে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের একটু লজ্জাবোধও হচ্ছে না যে, তাদের আয়োজনে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী পাকসেনা বিনা বিচার, বিনা শাস্তিতে ছাড়া পেয়েছে। সেই ভারতই আজ স্বাধীনতা বিরোধী ইস্যু, যুদ্ধাপরাধ ইস্যু নতুন করে সৃষ্টি করে বাংলাদেশের জাতীয় সংহতিকে বিনষ্ট এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে চায় শুধু এ লক্ষ্যেই যাতে বাংলাদেশের বন্দরসমূহ, বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে বহুমুখী করিডোর, বাংলাদেশের গ্যাসের মতো মূল্যবান খনিজ, বাংলাদেশের মার্কেট এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব তাদের মুঠির মধ্যে চলে আসে।
Tuesday, March 30, 2010
যুদ্ধাপরাধ-প্রোপাগান্ডা একটা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দিয়ে আড়াল করে বিশেষ দল বিশেষ রাজনীতিকদের টার্গেট করা হয়েছে
যুদ্ধাপরাধ-বিচার-প্রোপাগান্ডার পেছনে রাজনৈতিক যোগসাজশের বিষয়টি ক্রমেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে জাতীয়তাবাদী, ইসলামী ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিকদের হয়রানি, হেনস্তা ও জেল-জুলুমের মাধ্যমে রাজনৈতিক ময়দান থেকে তাদের সরিয়ে দিয়ে দেশের জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী রাজনীতিকে দুর্বল করে প্রতিবেশী একটি দেশের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করাই এই ষড়যন্ত্রের লক্ষ্য। যুদ্ধাপরাধীদের তথাকথিত তালিকা প্রকাশের মধ্যদিয়ে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও যোগসাজশের একটা নগ্ন প্রকাশ ঘটেছে। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে যুদ্ধাপরাধ হোক, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হোক সব অপরাধই সংঘটিত হয়েছে পাকসেনা, পাক-মিলিশিয়া, পাক-পুলিশ ও সহযোগী রেজাকার, আলবদর, আল-শামস এর দ্বারা। এর মধ্যে অপরাধের ৯৫ ভাগই করেছে পাক-সেনারা। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের যে তালিকা প্রকাশ করেছে ষড়যন্ত্রকারীরা তার মধ্যে ৯৫ ভাগ অপরাধের জন্য দায়ী পাক-সেনাদের কারও নাম নেই, নাম নেই অর্গানাইজ্ড বাহিনী পাক-মিলিশিয়া, পাক-পুলিশ, রেজাকার, আল বদর, আল-শামসের কমান্ডার-কর্মকর্তাদের। তার বদলে যাদের নাম প্রচার করা হয়েছে তারা ইসলামী ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নেতা-কর্মী। এটা সম্পূর্ণভাবেই রাজনৈতিক একটা যোগসাজশ দেশের দেশপ্রেমিক রাজনীতিক ও রাজনীতির বিরুদ্ধে। যে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ২০০৭ সালের নির্বাচন বানচাল হয়েছিল, সে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যুদ্ধাপরাধ ইস্যু সামনে আনা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর তাদেরই মনোনীত আওয়ামী লীগ সরকার সে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়েছে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটসহ মানবতা বিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের জন্য সরকার ১৯৭৩ সালের International Crimes (Tribunal) Act-এর অধীনে গত ২৫শে মার্চ একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছেন। এর সাথে একটি তদন্ত সংস্থা ও আইনজীবী প্যানেলও ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারিভাবে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধীদের একটি তালিকা তৈরি এবং তালিকাভুক্ত ব্যক্তিরা যাতে দেশের বাইরে যেতে না পারেন তার জন্য স্থল, নৌ ও বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশনে এই তালিকা সরবরাহ করে রেড এলাট জারী করা হয়েছে বলে জানা গেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য এই ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা দেখে পর্যবেক্ষক মহল স্তম্ভিত ও হতবাক হয়ে পড়েছেন। তারা সরকারের এই উদ্যোগকে যুদ্ধাপরাধ নয় বরং ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থী রাজনৈতিক প্রতিদ্বনদ্বীদের নির্মূল করার নির্লজ্জ প্রয়াস বলে অভিহিত করেছেন।
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধকালীন যুদ্ধাপরাধের বাস্তবতা উল্লেখ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে, ঐ সময়ে এই অঞ্চলে যে অপরাধ হয়েছে তার শতকরা ৯৫ ভাগ করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তৎকালীন সামরিক সরকারের বিভিন্ন অর্গানগুলো। পক্ষান্তরে ৩৯ বছর পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধীদের যে তালিকা তৈরি করা হয়েছে তাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী বিভিন্ন আধাসামরিক ও সশস্ত্র বেসামরিক সংস্থা বিশেষ করে ইপিআর, ফ্রন্টিয়ার রেঞ্জ, পুলিশ, আনসার, রাজাকার, আলবদর, আল শামস এর কোনও সদস্যের নাম নেই। যাদের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে তাদের সবাই হচ্ছেন জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা যারা সামরিক বেসামরিক সংগঠিত কোনও দলেরই সদস্য ছিলেন না। এই তালিকায় যেমন রাজাকার, আলবদর, আল শামছ কমান্ডারদের নাম অনুপস্থিত তেমনি নাম নেই তৎকালীন পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের যারা পাকিস্তানের পক্ষ হয়ে প্রশাসনিক আদেশ-নির্দেশের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ দমনের নামে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করেছিলেন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন যে, ভারতের নির্দেশে শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ৯৫ শতাংশ অপরাধের হোতাদের ক্ষমা করে পাকিস্তানে ফেরৎ পাঠিয়ে ছিলেন এখন তারই কন্যা শেখ হাসিনা ভারতের নির্দেশেই অবশিষ্ট ৫ শতাংশ অপরাধীদের বাদ দিয়ে নিরপরাধ রাজনৈতিক প্রতিদ্বনদ্বীদের বিচারের প্রহসন করে একদিকে নিজের ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করতে চাচ্ছেন অন্যদিকে ১৫ কোটি মুসলমানের এই দেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদের নিয়ন্ত্রণও নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। ট্রাইব্যুনাল গঠন ও সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা তৈরিকে তারা বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে বিচারের মহড়া বলে অভিহিত করেছেন। আইনমন্ত্রীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তারা বলেছেন যে, তিনি একাধিকবার তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনও ব্যক্তিকে যুদ্ধাপরাধী বলা বেআইনী বলে উল্লেখ করা সত্ত্বেও সরকার কর্তৃক এমনকি তদন্ত সংস্থা গঠনের পূর্বেই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দেশের স্বনামধন্য রাজনীতিকদের চিহ্নিত করে তালিকা প্রকাশ করা এবং তার ভিত্তিতে বৈধ ও আইনানুগ নাগরিকদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা ফ্যাসিবাদের বহিঃপ্রকাশ বৈ আর কিছুই নয়। তাদের মতে আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত যুদ্ধাপরাধীদের সংজ্ঞায় যেমন তারা পড়েন না তেমনি Rome Statute -এর অনুচ্ছেদ ৭-এ বিধৃত মানবতা বিরোধী অপরাধের (Crime Against Humanity) সাথেও তাদের সম্পৃক্ততা নেই। বলাবাহুল্য সম্প্রতি বাংলাদেশ এই Statute এ স্বাক্ষর করেছে। এ প্রেক্ষিতে সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বনদ্বীদের নির্মূল করার লক্ষ্যে যুদ্ধাপরাধের নামে বিচারের প্রহসন করে নিজেই মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করছেন বলে ওয়াকিবহাল মহল মনে করেন। একটা বিষয় এখানে লক্ষণীয় যে, ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর থেকে বিচারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এই প্রশ্নের প্রধান কারণ হচ্ছে বিচারের বিলম্ব। অপরাধ হয়েছে ১৯৭১ সালে। অপরাধীদের অপরাধ সনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের জন্য সাত সদস্যের তদন্তকারী সংস্থা গঠন করা হয়েছে ৩৯ বছর পর ২০১০ সালে। এ যাবত সারা দুনিয়ায় যুদ্ধাপরাধের যতগুলো বিচার হয়েছে তার সবগুলো ক্ষেত্রেই যুদ্ধের অব্যবহিত পর পরই অপরাধীদের সনাক্ত করা হয়েছে, তাদের অপরাধসমূহের বিস্তারিত আলামতসহ যাবতীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে তা সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং তাদের তাৎক্ষণিকভাবে আটক করে বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে। যারা পালিয়ে গেছে, তাদের পলাতক অবস্থা থেকে ফিরিয়ে এনে বিচার করা হয়েছে। কিন্তু কোথাও কথিত যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধ খোঁজা ও সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের জন্য উনচল্লিশ চল্লিশ বছর পর তদন্ত সংস্থা নিয়োগ করার নজির নেই। বলাবাহুল্য যে আইনে এই ট্রাইব্যুনাল ও তদন্ত সংস্থা এবং আইনজীবী প্যানেল গঠন করা হয়েছে সেই আইনটি ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীদের মধ্য থেকে অপরাধের ভয়াবহতার ভিত্তিতে চিহ্নিত ১৯৫ জন সামরিক যুদ্ধাপরাধীর বিচারের জন্য তা গঠন করা হয়েছিল। যুদ্ধবন্দী যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেয়ার পর এই আইনের কার্যকারিতা থাকার কথা নয়। কেননা অনুকম্পা প্রদর্শনও বিচারের একটা অংশ; ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ত্রিদেশীয় চুক্তির ভিত্তিতে ক্ষমা প্রদর্শন করে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্য যুদ্ধাপরাধীদের দেশে ফেরত পাঠানোর পর এই আইন কার্যত; অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ হয়েছে তার ৯৫ শতাংশই সেনাবাহিনীর সদস্যরা করেছে, অবশিষ্ট ৫ শতাংশ করেছে বেসামরিক অর্গানাইজড ফোর্সের সদস্যরা। এই বেসামরিক ফোর্সের সদস্য ও অন্যান্য অপরাধীদের বিচারের জন্য কলাবরেটার আইন হয়েছিল এবং ঐ আইনের অধীনে বিচারও শুরু হয়েছিল কিন্তু সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে সব মামলার বিচার করা করা যায়নি। ফলে ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর মাসে এসে কলাবরেটর আইন তৎকালীন সরকারকে বাতিল করতে হয়েছে। বলাবাহুল্য, জামায়াতের যে সমস্ত নেতার বিরুদ্ধে এখন যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনার কথা বলা হচ্ছে তাদের মধ্যে একজন ছাড়া আর কারুর বিরুদ্ধে দালাল আইন বা দেশের প্রচলিত কোন আইনে কোন মামলা ছিল না। যে একজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল তিনি ছিলেন তৎকালীন সিটি জামায়াতের অফিস সেক্রেটারি জনাব আবদুল খালেক মজুমদার। তার বিরুদ্ধে শহীদুল্লাহ কায়সারের অপহরণ এবং আল বদরের সদস্য হিসেবে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ ছিল। আদালতের রায়ে তিনি বেকসুর খালাস পান। অধ্যাপক গোলাম আযমের নাগরিকত্ব মামলায়ও তৎকালীন এটর্নি জেনারেল কর্তৃক তার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছিল। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে যুক্তি-প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু মাননীয় আদালত তা গ্রহণ করেননি। এ ব্যাপারে আদালতের রায়ও পর্যবেক্ষণ ছিল নিম্নরূপ :
Except some news items and one photograph showing that the petitioner (Prof. Golam Azam) met General Tikka Khan or General Yahya Khan there is nothing to directly implicate the petitioner in any of the atrocities alleged to have been perpetrated by the Pakistani Army or their associates, the Rajakar Al Badars or the Al Shams. ... We do not find anything that the petitioner was in any way involved in perpetrating the alleged atrocities during the war of independence. অর্থাৎ, পত্র-পত্রিকার কতিপয় নিউজ আইটেম এবং জেনারেল টিক্কা খান কিংবা জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সাথে আবেদনকারীর (অধ্যাপক গোলাম আযম) সাক্ষাৎকে ভিত্তি করে প্রদর্শিত একটি ছবি ছাড়া পাকিস্তান আর্মি কিংবা তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আল শামসের নৃশংসতার সাথে তাকে সরাসরি সম্পৃক্ত করার মতো কিছু নেই। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি (আবেদনকারী) কথিত নৃশংস কর্মকান্ড পরিচালনা ও অব্যাহত রাখার সাথে কোনভাবে জড়িত ছিলেন এ ধরনের কিছু আমরা পাইনি।
দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পরও অধ্যাপক গোলাম আযমকে যুদ্ধাপরাধীদের তালিকার শীর্ষে দেখা যায়। এই রায় ছিল হাইকোর্টের ও অধ্যাপক গোলাম আযমের অনুকূলে। সরকার পক্ষ এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছিলেন এবং সুপ্রিম কোর্ট আপিল খারিজ করে দিয়েছিলেন। আদালতের রায়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মানবতা বিরোধী অপরাধের সাথে তিনি বা তার দল যে সম্পৃক্ত ছিলেন না, তা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং এ প্রেক্ষিতে তার নাগরিকত্ব বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্তকে বেআইনি ঘোষণা করে তার নাগরিকত্বকে পুনর্বহাল করা হয়েছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, আদালতের রায়ের প্রতি আওয়ামী লীগের কোন শ্রদ্ধা নেই, তাদের কাছে এই রায়ের কোন মূল্যও নেই। হাইকোর্ট যে রায় দিল, সুপ্রিম কোর্ট যে রায় বহাল রাখলো, তার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে তারা এখন ট্রাইব্যুনালে বিচার করে তাকে ফাঁসি দিতে চান। এর অর্থ হচ্ছে, রায় তারা আগে থেকেই লিখে রেখেছেন। যেহেতু এই রায়ের সাথে হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের রায় মিলেনি সেহেতু তারা তা মানবেন না, নিজেদের রায় ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিকতা দিয়ে তা-ই কার্যকর করবেন। তাদের রায়ের সাথে অপরাধের সম্পর্ক নয়, সম্পর্ক হচ্ছে আধিপত্যবাদের নির্দেশ এবং ইসলাম ও রাজনৈতিক বিদ্বেষের। অভিযুক্ত অন্যান্যের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। কাজেই এ বিচার নিরপেক্ষ হতে পারে না, হবে একটা প্রহসন।
তালিকাভুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের শতকরা ৯৫ ভাগ ইসলামী রাজনীতি করেন এবং আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বনদ্বী। ইসলামী রাজনীতি করায় এবং আওয়ামী নেতৃত্বের বিকাশে চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়ায় একাত্তর সালের ৪ থেকে ১০ বছরের শিশু-কিশোরও বর্তমানে জামায়াত রাজনীতিতে সক্রিয় এমন কিছু ব্যক্তিত্বকেও অত্যন্ত হাস্যাস্পদভাবে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ঢাকা মহানগরী আমীর রফিকুল ইসলাম খান, চট্টগ্রামের আমীর ও এমপি শামছুল ইসলাম এবং খুলনা মহানগরী আমীর ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার এদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৭১ সালে তাদের বয়স ছিল যথাক্রমে সাড়ে চার, আট ও দশ বছর। আওয়ামী লীগ তাদের যুদ্ধাপরাধী বানিয়ে দিয়েছে।
প্রতিহিংসা এবং প্রতিদ্বনদ্বী নির্মূলই যে যুদ্ধাপরাধী চিহ্নিতকরণের মূল মানদন্ড হিসেবে কাজ করেছে তা দেখার জন্য বেশি দূর যাবার প্রয়োজন নেই বলে অনেকেই মনে করেন। বিগত নির্বাচনের ফলাফল পরীক্ষা করলেই এর সত্যতা ফুটে উঠবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সাড়ে চার বছরের শিশু রফিকুল ইসলাম খান জামায়াতের রাজনীতিতে যোগ দিয়ে বিগত ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে প্রতিদ্বনিদ্বতা করে ভোট কারচুপির মুখেও ৯৭,৪৬৩ ভোট পেয়েছেন। তার প্রতিদ্বনদ্বী আওয়ামী লীগের শফিকুল ইসলাম পেয়েছেন ১,৬২,৫০৩ ভোট। রফিকুল ইসলামের এটা ছিল প্রথম নির্বাচন এবং নির্বাচনে জনপ্রিয়তার যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন তাতে আঁতাতের নির্বাচনে বিজয়ী ক্ষমতাসীন দল ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় জনাব রফিকুল ইসলাম খানকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচার করে ফাঁসি দিতে পারলে ময়দান পরিষ্কার হবে বৈকি। একইভাবে চট্টগ্রাম-১৪ এর এমপি শামছুল ইসলাম বিগত নির্বাচনে ১,২০,৩৩৯ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বনদ্বী পেয়েছেন ৬৩,৪১২ ভোট। তিনিও যুদ্ধাপরাধী। ঠাকুরগাঁও-২ আসনের জামায়াত নেতা আবদুল হাকিম বিগত নির্বাচনে ৯৮,৭৬৫ ভোট পেয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বনদ্বী ১৪ দলের দবিরুল ইসলাম পেয়েছিলেন ১,০২,৮৩৩ ভোট, ব্যবধান খুবই কম। পাবনা-১ আসনে জামায়াত আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী একাধিকবার এমপি ছিলেন। গত নির্বাচনে তিনি ১,২২,৯৪৪ ভোট পেয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বনদ্বী আওয়ামী লীগের শামছুল হক টুকু (বর্তমানে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী) পেয়েছিলেন ১,৪৫,০১২ ভোট। পাবনা-৫ আসনে জামায়াত প্রার্থী মাওলানা আবদুস সুবহান একাধিকবার এমপি ছিলেন। তিনি গত নির্বাচনে এই আসনে ১,৪১,৬৩৩ ভোট পেয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বনদ্বী ক্ষমতাসীন দলের গোলাম ফারুক প্রিন্স পেয়েছিলেন ১,৬১,৪১৩ ভোট। পাবনার এই দুটি আসনে আওয়ামী লীগের ভোট কারচুপির ধরন-প্রকৃতি সম্পর্কে পত্র-পত্রিকায় বহু রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে।
খুলনা-৫ আসনের সাবেক এমপি জামায়াত নেতা গোলাম পরওয়ার গত নির্বাচনে ১০৫,৩১২ ভোট পেয়েছিলেন, তার নিকটতম প্রতিদ্বনদ্বী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ পেয়েছিলেন ১৪৪,৬০০ ভোট। খুলনা-৬ আসনে জামায়াতের রুহুল কুদ্দুস পেয়েছিলেন ১,১৬,১৬১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বনদ্বী সোহরাব আলী সানা পেয়েছিলেন ১,৩১,১২১ ভোট। চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে মাওলানা হাবিবুর রহমান পেয়েছিলেন ১,৪৩,৪১৮ ভোট, তার প্রতিদ্বনদ্বী আওয়ামী লীগের আলী আসগর ১৫,৬,৩২৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সাতক্ষীরা-৩ আসনে জামায়াতের রিয়াসত আলী পেয়েছিলেন ১৩৩,৮০২ ভোট এবং তার প্রতিদ্বনদ্বী বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী রুহুল হক পেয়েছিলেন ১,৪২,৭০৯ ভোট। সাতক্ষীরা-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী জনাব আবদুল খালেক পেয়েছিলেন১,১৪,৫৫৭ ভোট এবং মহাজোটের এমএ জাববার পেয়েছিলেন ১,৩৩,৪২৩ ভোট, একইভাবে সিলেট-৫ আসনে জামায়াতের সাবেক এমপি মাওলানা ফরিদউদ্দিন চৌধুরী পেয়েছিলেন ৭৮০৬১ ভোট পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগের হাফেজ আহমদ মজুমদার এই আসনে ১০৯৬৯০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। আবার সিলেট-৬ আসনে মাওলানা হাবিবুর রহমান পেয়েছিলেন ৫১৭৬৪ ভোট তার প্রতিদ্বনদ্বী মহাজোটের নূরুল ইসলাম নাহিদ পেয়েছেন ১৩৮,৩৫৩ ভোট।
আমি উপরে গত নির্বাচনে প্রতিদ্বনিদ্বতাকারী যে কয়জন জামায়াত প্রার্থীর কথা উল্লেখ করেছি আওয়ামী লীগের অভিযোগ অনুযায়ী এদের সকলেই যুদ্ধাপরাধীর তালিকায় রয়েছেন। তাদের প্রাপ্ত ভোট বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, গত কয়েকটি নির্বাচনে তাদের জনপ্রিয়তা বেড়েছে বই কমেনি। এরা আবার শুধু নির্বাচনমুখী নেতাও নন। শিক্ষা-দীক্ষাসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নিজ এলাকা এবং তার বাইরেও তারা মানুষের সেবার যে নিদর্শন রেখেছেন তা অনন্য। তাদের এই সেবা জনপ্রিয়তা ও কৃতিত্ব ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে যে ঈর্ষার সৃষ্টি করেছে যুদ্ধাপরাধের বিচার তারই বহিঃপ্রকাশ বলে আমার ধারণা।
ট্রাইব্যুনালের স্বাধীনতা নিয়েও আমার মনে প্রশ্ন রয়েছে। ১৯৭৩ সালে জারি করা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল আইনটি আমি অত্যন্ত মনোযোগের সাথে পড়েছি। এই আইনের কোথাও বলা নাই যে এর অধীনে গঠিতব্য ট্রাইব্যুনাল স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হবে। ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের ট্রাইব্যুনাল পরিদর্শন এবং বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা প্রদান থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ট্রাইব্যুনালটি নিরপেক্ষভাবে কাজ করুক তা তারা চান না, ফরমায়েশী একটি বিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে থাকুক এটাই তাদের কাম্য। পক্ষান্তরে আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী যে কোন বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে হবে। আবার বর্তমানে যে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে কিংবা আরেকটি ট্রাইব্যুনাল করা যাবে না এ ধরনের কোনও বাধ্যবাধকতা আইনে নেই। আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের বিচারক জেনারেল কোর্ট মার্শালের বিচারকও হতে পারে এবং উচ্চ আদালতের বিচারকরা এর সদস্য হতে পারবেন। যদি কোনও বিচার কাজে একজন সামরিক অফিসার থাকেন এবং উচ্চ আদালতের বিচারকও থাকেন তাহলে সেটা নিরপেক্ষ এবং স্বাধীন হবে কি না সেটাও ভেবে দেখার বিষয়।
আবার পদ্ধতিগত দিক থেকে এখানে সমস্যা আছে। আইনে সাক্ষীদের ক্ষেত্রে বলা আছে, প্রশ্ন করলে সাক্ষীদের অবশ্যই উত্তর দিতে হবে- অর্থাৎ ট্রাইব্যুনাল প্রশ্ন করলে ‘নো' বলা যাবে না। কিন্তু আমি তো উত্তর নাও দিতে পারি। এখানে সাক্ষীদের আগে থেকেই যদি পড়িয়ে আনা হয় তাহলে তারা তো সর্বদা হাঁ-ই বলবে, না বলার কথা নয়। এটা যুদ্ধাপরাধ বিচারের আন্তর্জাতিক মানদন্ডের পরিপন্থী।
এখানে আরেকটি বিষয়ও রয়েছে, বলা হয়েছে যে জানা ঘটনার ক্ষেত্রে আদালত Judicial notice নেবে। অর্থাৎ ধরে নেবে যে এটা সত্যি। অর্থাৎ এখানে কোনও সাক্ষী-সাবুদ তথ্য আলামত কোনও কিছুরই প্রয়োজন নেই। যেহেতু অভিযোগকারীদের সবাই বলছে লোকটি চোর, চোর না হলেও আদালত ধরে নেবে যে, লোকটি চোর। তারা বলবে আমরা সবাই জানি লোকটি দোষী, তাকে ফাঁসি দেয়া হোক। আদালত তাকে ফাঁসি দেবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে যারা বলছেন আমরা জানি তারা কিন্তু কেউই ঘটনার সময় দেশে বা অকুস্থলে ছিলেন না, দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ইনাসাফ বা নৈতিকতার দৃষ্টিতে এটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কে আমার যে সীমিত অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতা তাতে আমি নিশ্চিত যে তিয়াত্তরের আইনে যে বিচার প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে এবং যা এখন অনুসৃত হচ্ছে তা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমাদের দেশে Independent Investigation Agency যেমন নেই তেমনি Independent Prosecution Agencyও নেই। আবার আমাদের Prosecutor দেরও আন্তর্জাতিক আইন বোঝা অপরিহার্য। আবার Defence Lawyer নিয়েও সমস্যা যে হবে না তা হলফ করে বলা যাবে না। ১৯৭৩-৭৪ সালে আওয়ামী লীগের প্রথম ‘শাসনামলের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, Collaborator Act-এর অধীনে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল তাদের পক্ষে আদালতে যাতে কেউ ওকালতনামা না দেয় এবং পক্ষ সমর্থন না করে সে জন্য আওয়ামী লীগ-যুবলীগ, ছাত্রলীগ কর্মীরা উকিলদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শাসিয়ে আসতো। তাদের কথা না শোনায় দু'জন উকিল তাদের নির্মম প্রহারে প্রাণও হারিয়েছিলেন। এবার যে ব্যতিক্রম হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? এর মধ্যে শোনা যাচ্ছে আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা Defence Lawyer-দের স্বাভাবিক কাজ-কর্মে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে এবং অভিযুক্তরা যাতে বিদেশী কোনও আইনজীবীকে দেশে আনতে না পারে তার উদ্যোগও গ্রহণ করেছে। এই দলটির জন্য এটা স্বাভাবিক। গত দেড় বছরে উচ্চ আদালতের বিভিন্ন মামলায় দলীয় এটর্নি জেনারেল কর্তৃক এমনকি মাননীয় আদালতকে পর্যন্ত ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ডিক্টেট করার প্রবণতাও একাধিক দৃষ্টান্ত এটাই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে ইনসাফের নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া তাদের হাতে নিরাপদ নয়। যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রক্রিয়া তো আরো বেশি প্রভাবিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়াকে নিরপেক্ষ করার জন্য আমি মনে করি জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যথেষ্ট অবদান রাখতে পারে। বিচারিক প্রক্রিয়াকে নির্বিঘ্নকরণ, বিচারের নিরপেক্ষতা নিশ্চিতকরণ এবং অভিযুক্তদের মৌলিক মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য এটি অপরিহার্য। বিচারকদের ব্যাপারেও কিছু কথা আছে। যেহেতু বলা হচ্ছে যে এই বিচারে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা হবে এবং আন্তর্জাতিক ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালের অধীনে বিচার হবে সেহেতু আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন সম্পর্কে তাদের কতটুকু অভিজ্ঞতা আছে তা দেখা দরকার। এ ক্ষেত্রেও কিছু কিছু ওরিয়েন্টেশন ও ট্রেনিংয়ের জন্য এবং কিছু Perspective দেয়ার জন্য সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। এই সহযোগিতা জাতিসংঘ, দ্বিপাক্ষিকভাবে অন্য কোনো রাষ্ট্র কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দিতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।
রাজায় যা বোঝে রাখালেও তা বোঝে: সৈয়দ আবুল মকসুদ |
এই যে রাজা ও রাখালের বোঝার বিষয়ের কথা বলা হয়েছে, তা মহাজাগতিক কোনো রহস্য নয়, দর্শনতত্ত্ব নয়, গ্রহ-নক্ষত্রবিষয়ক কোনো জ্যোতির্বিদ্যাও নয়। স্রেফ জগত্-সংসার বা রাজ্যের ভালো-মন্দের ব্যাপার। যে যুগের কোনো জ্ঞানী এই প্রবচনের প্রবর্তক, সে সময়টি ছিল রাজতন্ত্রের। রাজ্য শাসন করতেন রাজা। রাখাল বলতে খুব নগণ্য প্রজাকে বোঝানো হয়েছে, যার বিদ্যাবুদ্ধির দৌড় নিতান্ত কম।
আমরা এখন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের নাগরিক। গণতন্ত্রে নাগরিকদের আক্কেলবুদ্ধিকে অবহেলা করার উপায় নেই। কারণ, যে নাগরিক তার রায়ের দ্বারা কাউকে ক্ষমতায় বসাতে পারে এবং কাউকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারে—তার ক্ষমতা কম কিসে। সে যে কিছুই বোঝে না, তা নয়। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতরা যা বোঝেন, একজন সাধারণ নাগরিকও তা-ই বোঝে। একজন ফিকশন বা কল্পকাহিনির লেখক যা বোঝেন, হয়তো একজন কলাম লেখক তাঁর চেয়ে সামান্য কম বোঝেন। অর্থাৎ সবাই কমবেশি বোঝেন।
ক্ষমতাসীন দলের নেতা, শীর্ষ আমলা, বুদ্ধিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নাটক ও সংগীতজগতের স্বনামধন্যরা, সংবাদপত্রের উপসম্পাদকীয় লেখকেরা দেশের ভালো-মন্দ ও ভবিষ্যত্ নিয়ে যা বোঝেন, সাধারণ নাগরিকেরাও যে তা বোঝে না, তা নয়। পিলখানার পাশবিকতার কারণ ও পরিণতি নিয়ে বিডিআরের মহাপরিচালকের বোঝাই পরম বোঝা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর বিবেচনা আরও মূল্যবান। কিন্তু ওই বর্বরতায় যে সেনা কর্মকর্তা অথবা বিডিআর সদস্য নিহত হয়েছেন, তাঁর বৃদ্ধ বাবাও গ্রামের বাড়িতে আমগাছতলায় বসে বসে ভাবেন। অনেক ‘কেন’-র উত্তর তিনি খোঁজেন। উত্তর পানও। বাড়ির ভেতর থেকে খিটখিটে মেজাজের বুড়ি অথবা বিধবা বউমা ভাত খাওয়ার জন্য ডাকেন। নাতনি এসে হাত ধরে টানে। পুত্রহারা বৃদ্ধ যে চোখের কোনা মুছে উঠে দাঁড়িয়ে হেঁটে বাড়ির ভেতর যাবেন সে শক্তি তাঁর পায়ে নেই। পুত্রকে তিনি হারিয়েছেন, কিন্তু দেশের ভবিষ্যত্ নিয়ে ভাবার শক্তি তিনি হারাননি।
স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের সমাজে যুক্তিশীল বিচার-বিবেচনার বিষয়টি লোপ পায়। তার জায়গাটি দখল করেছে পামপট্টি বা স্তাবকতা। আজ প্রত্যেকেই প্রত্যেককে পাম মারছে। মন্ত্রী-রাজনীতিকেরা পাম দিচ্ছেন তাঁদের ভোটারদের। আমলারা পামপট্টি দিচ্ছেন মন্ত্রীকে বা দাতা গোষ্ঠীর লোকদেরও শুধু নয়, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতা ও ক্যাডারদেরও। সংস্কৃতিজগতের কর্ণধারেরা তেল দিচ্ছেন ও পাম মারছেন সেই দপ্তরের আমলাদের, যারা বিদেশে ডেলিগেশন পাঠানোর তালিকা তৈরি করেন। প্রকাশক পাম মারছেন লেখককে, লেখক মারছেন প্রকাশককে। লেখা ছাপতে পত্রিকার সম্পাদককে পামপট্টি দিতে যান নতুন ও বুড়ো লেখকেরা। কেউ কাউকে তার ভুল ধরিয়ে না দিয়ে, তার ভুলের জন্য সমালোচনা না করে অযাচিতভাবে পাম দিচ্ছেন। পুরোনো প্রজন্মকে পাম দিচ্ছে নতুন প্রজন্মের চালাকেরা। অন্যদিকে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য শাসন না করে নতুন প্রজন্মকে পাম দিচ্ছেন প্রবীণেরা। এ অবস্থায় সমাজ ও রাষ্ট্রের গলদ দূর হবে কী করে?
নতুন প্রজন্ম নিয়ে আমাদের অনেক মন্ত্রী, রাজনীতিক ও লেখক ভয়াবহ আশাবাদী। ‘নতুন প্রজন্ম’ কথাটি এমনভাবে ব্যবহূত হচ্ছে, মনে হচ্ছে, বাঙালি জাতির আর যেন কোনো প্রজন্ম ছিল না। অন্তত পত্রিকা পড়ে তা-ই মনে হয়। ‘নতুন প্রজন্ম’কে মন-প্রাণ দিয়ে প্রশংসা করা হচ্ছে সম্ভবত এই জন্যও যে তারা মহাজোটের প্রার্থীদের ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছে। এবং ২০২১ সালের আগেই একটি শ্রেষ্ঠ বাংলাদেশ তারা গঠন করে ফেলবে—সে ব্যাপারে আশাবাদী তো কেউ হতেই পারেন।
দুর্ভাগ্যবশত আমার অবস্থান তাদের বিপরীতে। আমি পরম হতাশাবাদী। নতুন প্রজন্মকে ফুলিয়ে গদগদভাবে লিখতে পারি না বলে নিজের ওপরই রাগ হয়। স্বার্থপরের মতো আমি আমার নিজের প্রজন্ম ও তার পূর্ববর্তী প্রজন্ম দিয়ে গর্বিত। আমি সেই প্রজন্ম নিয়ে গর্বিত যে প্রজন্মের যুবকেরা একটি ছেঁড়া শার্ট গায়ে দিয়ে অবাঙালি আধা-ঔপনিবেশিক শাসকদের বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকে বানচাল করে দেয়। যাঁরা পুলিশের রাইফেলের সামনে বায়ান্নতে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়েছেন। আমি সেই প্রজন্মকে সালাম করি, যে প্রজন্ম প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ১৯৬২তে দুর্জয় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেই প্রজন্মকে সম্মান করি, যারা ন্যায়সংগত দাবিতে রাজপথ উত্তাল করেছে, কিন্তু গাড়ি ভাঙচুর করে যন্ত্রাংশগুলো লুট করত না। আমি আমার সেই প্রজন্মের জন্য অহংকার করি, যে প্রজন্মের মানুষ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান বিচারকের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। সেই প্রজন্মের কথা বারবার স্মরণ করি, যে প্রজন্ম ঊনসত্তরে গণ-অভ্যুত্থান ঘটায়। সেই প্রজন্মের কাছে বারবার মাথা নত করি, যারা একাত্তরের স্রষ্টা।
দুই হাতে দুই কানে সেলফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হতে গিয়ে যে প্রজন্মের যুবক-যুবতী গাড়ির ধাক্কা খায়, সেই প্রজন্মকে নিয়ে রঙিন স্বপ্ন দেখা আমার মতো ফোনহীন ও প্রেমহীন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আমাদের প্রজন্মের মানুষেরও হূদয় ছিল। তারাও প্রেম করেছে। ভালোবাসার ইতিবাচক সাড়া পেলেও প্রেয়সীকে ফুল দিয়েছে, প্রত্যাখ্যাত হলেও একটি গোলাপ ও একটি চিরকুট দিয়ে শরিফ মিয়ার দোকানের পাশের বাগানে ঝিম মেরে বসে থেকেছে। অথবা লাইব্রেরিতে গিয়ে যাযাবরের দৃষ্টিপাত সেলফ থেকে নিয়ে পাতা উল্টে বারবার আবৃত্তি করেছে: ‘মিনি সাহেব, আমি ইডিয়টই বটে, আমি উপহাসকে মনে করি প্রেম, খেলাকে ভেবেছি সত্য।...’ অথবা যেদিন বজ্রপাতের মতো শুনেছে, ‘তুমি আর আমার সাথে মেলামেশা করো না, আব্বা-আম্মা পছন্দ করেন না, ছোট চাচাও খুব রাগী।’ আসলে মেয়েটি নিজেই ওকে বাতিল করেছে। এবং বিয়েও ঠিক হয়েছে নীলফামারীর সড়ক ও জনপথ বিভাগের এক সুদর্শন সাবডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে। সেকালে তারা এ ধরনের বজ্রাঘাতে আহত হয়ে সোজা চলে যেত গুলিস্তান বা নিশাত সিনেমা হলে। এক সপ্তাহে এগারবার দেখেছে দ্বীপ জ্বেলে যাই, মেঘে ঢাকা তারা অথবা হারানো সুর।
যে প্রজন্ম সহপাঠীকে প্রেম নিবেদন ব্যর্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মুখে এসিড ছুড়ে দেয়, সে প্রজন্মের ভবিষ্যত্ নিয়ে তাদের স্নেহপ্রবণ শিক্ষকেরা আশাবাদী হতে পারেন, কিন্তু আমার মতো চিরকালের ছাত্র পারে না। যে প্রজন্ম পরীক্ষার তারিখ পছন্দমতো পেছানোর জন্য শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলে, সে প্রজন্ম নিয়ে ‘ভীষণ আশাবাদী’ কীভাবে হই? ভর্তি ফি কমানোর জন্য টিভি ক্যামেরার সামনে উপাচার্যের মুখের কাছে জুতা নাচায় যে প্রজন্মের মানবসন্তান সে প্রজন্মকে প্রশংসা করি কীভাবে?
কোনো মিলনায়তনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে, বিদ্যুৎ চলে যাওয়া মাত্র ঝলসে উঠল প্রজন্মের পুরুষত্ব্ব। সহপাঠী বা পাড়ার মেয়েদের টান দিয়ে কামিজ ছিঁড়ে হায়েনার মতো গায়ে হাত দেয় যে প্রজন্ম, সে প্রজন্মের ২০২১ সালে সোনার বাংলা গড়ার সময় কোথায়? সেই প্রজন্ম নিয়ে প্রাচীনকালের সুফিদের মতো এত ‘স্বপ্ন’ দেখা কেন? যে প্রজন্ম সিট দখল করতে গিয়ে সহপাঠীর মাথা ফাটায় বা হাড্ডি গুঁড়া করে, টেন্ডারের বাক্স মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে নেতার বাড়িতে চলে যায়, ভর্তি-বাণিজ্যে কোটিপতি হয়, সে প্রজন্ম নিয়ে কি স্বপ্ন দেখা সম্ভব?
আমাদের প্রজন্মের ছাত্রনেতারা সবাই নির্মল ছিলেন তা বলব না। পরবর্তী জীবনে অনেকের পদস্খলন ঘটেছে। আমরা কোনো না কোনো সংগঠনের সমর্থক বা কর্মী ছিলাম। যে যে সংগঠনেরই হোন না কেন, নেতাদের আমরা সবাই শ্রদ্ধা করতাম। কারা ছিলেন আমাদের প্রজন্মের উজ্জ্বল ছাত্রনেতা যাঁদের ত্যাগ এখনো স্মরণ করি: কাজী জাফর আহমদ, সুরঞ্জিত্ সেনগুপ্ত, সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মণি, আবদুর রাজ্জাক, মতিয়া চৌধুরী, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক, পংকজ ভট্টাচার্য, মোস্তফা জামাল হায়দার, মাহবুবউল্লাহ, শামসুজ্জোহা, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, তোফায়েল আহমেদ, নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং একটু পরেই মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, শেখ শহীদুল ইসলাম, নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, আব্দুল কাইয়ুম মুকুল, নূহ-উল আলম লেনিন প্রমুখ। ওই প্রজন্মের আরও পনেরোটি নাম উল্লেখ করলে শান্তি পেতাম।
ওই প্রজন্মের নেতা-কর্মীরা হলের সিট দখলে নেতৃত্ব দেননি, সারা রাত হলে হলে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়াও তাঁরা পছন্দ করতেন না। টেন্ডার নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো সময়ই ছিল না তাঁদের। ভর্তি-বাণিজ্য শব্দটি তখন আবিষ্কৃত হয়নি। উপাচার্য বা অধ্যক্ষকে তালা মেরে জানালা দিয়ে গালিগালাজ করার রেওয়াজ তখন ছিল না। শিক্ষককে জুতাপেটা করার কথা স্বপ্নেও কেউ ভাবেনি। চাঁদাবাজি তখন ছিল না—প্রয়োজনে সামান্য কয়েক টাকা চাঁদা তোলা হতো। আমাদের প্রজন্মে কোনো মেয়ের মুখে এসিড ছোড়া হতো না। গুলি করে কোনো মেয়ের চোখ কানা করা হতো না। প্রতিবেশী মেয়েটিকে উত্ত্যক্ত করে তার স্কুল-কলেজে যাওয়া বন্ধ করা হতো না বা তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হতো না। তারপর যেদিন ডাক এল, একটিমাত্র কাপড় নিয়ে গোটা প্রজন্মের মানুষ দেশের মুক্তির জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল। তা হলে কোন প্রজন্ম অপেক্ষাকৃত ভালো?
আমি জানি, প্রজন্মের সবাই এসিড ছোড়ে না, নেশাও করে না, মেয়েদের উত্ত্যক্তও করে না, পাড়ার দোকানে চা-মিষ্টি খেয়ে পয়সা না দিয়ে চলে যায় না, টেন্ডারবাজিও করে না। ওসব শতকরা পাঁচজন করতে পারে। কিন্তু কষ্টটা ওখানে যে, দলবদ্ধ প্রতিরোধ নেই কেন। পঁচানব্বই জনের ভূমিকাটা কী? ভোট দিয়েছে বলে প্রজন্ম যা খুশি তা-ই করবে? আইনের শাসন থাকলে খুনখারাবি, ভর্তি-বাণিজ্য, টেন্ডার ছিনতাই, চাঁদাবাজি, বখাটেপনা, ধর্ষণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মারামারি, ভাঙচুর প্রভৃতি হতে পারত না।
কোনো অবস্থার সুবিধাভোগী ও ভুক্তভোগীর একই অনুভূতি হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীনেরা সুবিধাভোগী আর সাধারণ মানুষ ভুক্তভোগী। বিএনপি ও তার সহযোগী দলগুলো কী বলল, তা যদি সরকার গ্রাহ্য নাও করে, ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা এবং বিখ্যাত গেরিলা যোদ্ধা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী কী বলছেন, তা তো মূল্যহীন নয়। তাঁরা বলছেন, দেশ ভালো চলছে না এবং অনেক স্বাধীনতাবিরোধী নবম জাতীয় সংসদে আছেন, রয়েছেন মন্ত্রিসভায়ও। ওদিকে সরকার ও সরকার-সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, সরকারের সমর্থনে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ।
অবিচারে নিমজ্জিত বাংলাদেশে ‘বিচার’ শব্দটি আজ খুবই উচ্চারিত। এবং বাংলাদেশে বিচার নয়, বিচারের রায়ই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ বিচারের আগেই বিচারের রায় কী হবে তা জানা চাই। বিচারের রায়ের চেয়েও জরুরি বিচারের রায় কার্যকর করা। এখন শুধু বিচার নয়, ‘দ্রুত বিচার’ শব্দটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এক প্রতিমন্ত্রী বলতে লাগলেন, ‘ষোলোই ডিসেম্বরের মধ্যেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর করা হবে।’
পিলখানা হত্যাকাণ্ড ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে গত কয়েক মাসে বিডিআরের মহাপরিচালক ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা অনেক রকমের বক্তব্য দিয়েছেন। এক প্রতিমন্ত্রী বলছেন, প্রতিটি গ্রামে ও ইউনিয়নে রাজাকারদের তালিকা টাঙিয়ে দেওয়া হবে। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় যারা শত্রুপক্ষের সহযোগিতা করেছে, খুনখারাবি করেছে তাদের বিচার ও শাস্তিই প্রাপ্য, তাদের নাম গ্রামের প্রবেশমুখে টাঙিয়ে দেওয়াটা সভ্যজগতের নিয়ম নয়। পৃথিবীর কোনো দেশে তা হয়নি। কোনো গণতান্ত্রিক সরকার তা করে না। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব রাজাকারের নাম পাথরে খোদাই না করে যেসব স্বাধীনতা সংগ্রামী ও মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতার বিন্দুমাত্র সুফল পাননি, তাদের কিছু উপার্জনের ব্যবস্থা করে দেওয়া।
শত্রুমিত্র সকলের ক্ষেত্রে আইনের নিরপেক্ষ অনুশীলন ছাড়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয় না—আদর্শ রাষ্ট্র তো নয়ই। কোনো এক পত্রিকার জরিপে দেখেছি, আমাদের বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে শতকরা ৭৭ জন নাগরিক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। নিশ্চয়ই তাঁরা সবাই বিরোধী দলের নন। খুনখারাবি নয়, তুচ্ছ কোনো মন্তব্যের কারণে বিরোধী দলের লোকদের বিরুদ্ধে রাশি রাশি মামলা হচ্ছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন আদালতে। মহামান্য ম্যাজিস্ট্রেট তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা সমন জারি করতে মুহূর্ত দেরি করছেন না। অন্যদিকে দণ্ডপ্রাপ্ত সরকারি লোকেরা নির্বিঘ্নে খালাস পাচ্ছেন প্রতিদিন। এর নাম আইনের শাসন নয়।
যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য শোনা যায়নি। এই নীরবতা অর্থহীন নয়। অন্যদিকে আমাদের ৪০তম স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন আমেরিকার কংগ্রেস এক বিশেষ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। কংগ্রেসের বাংলাদেশ ককাসের কো-চেয়ারম্যান জোসেফ ক্রাউলি প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। ৩৮০-৭ ভোটে তা পাস হয়। প্রস্তাবে ‘তিক্ততা ভুলে রাজনৈতিক নেতাদের একত্রে কাজ চালিয়ে যেতে এবং পারস্পরিক সম্পর্ক গভীর করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।’ এই প্রস্তাব আমাদের সরকারের জন্য একটি বার্তা।
দেশে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস-সংকট এখন সর্বকালের সবচেয়ে ভয়াবহ। মন্ত্রীরা অব্যাহতভাবে বলছেন, গত দুই সরকার ‘এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ’ ও ‘এক ফোঁটা পানি’র ব্যবস্থা করে যায়নি। তাই এই সংকট। সাধারণ মানুষের কাছে এর অর্থ: প্রত্যেক সরকার পরবর্তী সরকারের জন্য প্রচুর বিদ্যুৎ ও প্রকাণ্ড পুষ্করিণীতে টলটলে পানি রেখে যাবে, পরবর্তী সরকার তা শুধু ঘড়ায় ঢেলে বাড়ি বাড়ি বিতরণ করবে। বিদ্যুতের অভাবে কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাক, কৃষকের সেচের পাম্প বন্ধ থাক, সিএনজি পাম্পও বন্ধ থাক, ঘরের বাতি না জ্বলুক—কিন্তু মধ্যবিত্তের ঘরে পাখাটি যদি না ঘোরে তাদের চাঁদি গরম হবে এবং ঘুরতে থাকবে বনবন করে মাথা। মাথা গরম হলে ক্রোধের সৃষ্টি হয়।
সরকারের নীতি-নির্ধারকেরা কি এখনো বিশ্লেষণ করে দেখেননি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ফলাফল, জেলা বারগুলোর নির্বাচনী ফলাফল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের নির্বাচনের ফল, তারা কি কাগজেও পড়েননি বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির শ্রমিক অসন্তোষের খবর, পল্লীবিদ্যুৎ অফিসগুলোর ঘেরাওয়ের সংবাদ। এ-জাতীয় অমঙ্গলের তালিকা দিলে তা হবে দীর্ঘ। রাখালেও বোঝে, এসব সরকারের জনপ্রিয়তার ব্যারোমিটার।
বাংলাদেশে মৌলবাদী তৎপরতা বাড়ায় আমেরিকা ও তার মিত্ররা, খালেদা জিয়ার থেকে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে। এখন গণ-অসন্তোষের ফলে বাংলাদেশে উগ্র বাম বা মাওবাদী তৎপরতা বাড়লে আমেরিকা শুধু নয়, ভারতও শেখ হাসিনার সরকারের ওপর অপ্রসন্ন হবে। অন্ধ্র, বিহার, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড থেকে মাওবাদী রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত এসেছে। গ্রামীণ দারিদ্র্য বাংলাদেশে ভারতের চেয়ে কম নয়। পরিস্থিতির কারণে মাওবাদী তৎপরতা শুরু হলে শুধু জঙ্গিবাদ জঙ্গিবাদ বলে পার পাওয়া যাবে না। উগ্র বাম রাজনীতি জনপ্রিয় হলে ধর্মীয় জঙ্গিবাদ হাত গুটিয়ে নেবে। তখন ইসলামপন্থীদেরই পশ্চিমারা মদদ দেবে। চৌদ্দদলীয় মহাজোট তখন কী নিয়ে রাজনীতি করবে?
মানুষের দুর্দশা বাড়লে, বিদেশিদের সঙ্গে জনস্বার্থবিরোধী চুক্তি করলে, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে উত্তরবঙ্গে কয়লা উত্তোলন করতে গেলে, সেই কয়লা পানির দামে বিদেশিদের কাছে রপ্তানি করলে চরমপন্থী বাম আন্দোলন মাথা চাড়া দেবে। ইসলামি মৌলবাদীদের চেয়ে মাওবাদী চরমপন্থীদের পশ্চিমা বিশ্ব বেশি ভয় করে।
শুরুতে যা বলেছি, তা একটু বদলে বলতে চাই। কখনো কখনো রাখালেও যা বোঝে রাজাও তা বোঝার চেষ্টা করেন না।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।
